‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বনাম ‘পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র’ বিতর্কে সরগরম ভারত

ভারতের উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় বেতন বৃদ্ধি ও উন্নত কাজের পরিবেশের দাবিতে শুরু হওয়া শ্রমিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বাদানুবাদ শুরু হয়েছে। 

গত কয়েক দিনে শহরের প্রায় ৮০টি স্থানে অন্তত ৪০ হাজার কারখানা শ্রমিকের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যা দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। এই সহিংসতাকে কেন্দ্র করে সমাজবাদী পার্টি এবং কংগ্রেস রাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা শুরু করেছে। বিরোধীরা একে সরকারের চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশ সরকার একে একটি ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ এবং এর পেছনে ‘পাকিস্তানি যোগসূত্র’ থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। 

আগামী বছর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন এবং চলতি বছরে মে-জুন মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই বিক্ষোভ একটি বড় রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।Thumbnail Toshif Hasan (17)

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এই পরিস্থিতিকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন যে, সরকার আগে থেকেই এই বিক্ষোভের বিষয়ে জানত কিন্তু তা হতে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন যে, যদি এটি কোনো ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে তবে তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপিই দায়ী। ২০২৭ সালের নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হবে বলেও তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন। 

অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক আবেগঘন পোস্টে বলেন যে, এটি দেশের বঞ্চিত শ্রমিকদের আর্তনাদ যা দীর্ঘ সময় ধরে উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি তথ্য দিয়ে দেখান যে, একজন শ্রমিকের গড় বেতন মাত্র ১২ হাজার টাকা, অথচ বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে তারা ঋণের জালে ডুবে যাচ্ছেন। কংগ্রেস নেতা অজয় রাই পুলিশের টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আটককৃতদের মুক্তির দাবি করেছেন।

সরকার পক্ষ থেকে উত্তরপ্রদেশের শ্রমমন্ত্রী অনিল রাজভর এই অস্থিরতার পেছনে বিদেশের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভের পেছনে ‘পাকিস্তানি হ্যান্ডলারদের’ গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং সাধারণ শ্রমিকদের অরাজকতায় উসকানি দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও শিল্পক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যাতে তারা সরাসরি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন। Thumbnail Toshif Hasan (14)

উত্তরপ্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে যে, ইতিমধ্যে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নয়ডা পুলিশ কমিশনার লক্ষ্মী সিং দাবি করেছেন যে, পর্দার আড়ালে একটি সুসংগঠিত চক্র কাজ করছে যারা বিদেশি তহবিলও পেয়ে থাকতে পারে। পুলিশের মতে, ‘অতি-বামপন্থীরা’ এই বিক্ষোভ হাইজ্যাক করে সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে।

বিক্ষোভের মুখে উত্তরপ্রদেশ সরকার অদক্ষ, আধা-দক্ষ এবং দক্ষ শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ২১ শতাংশ বৃদ্ধির একটি অন্তর্বর্তীকালীন ঘোষণা দিয়েছে। গৌতম বুদ্ধ নগর ও গাজিয়াবাদে এই নতুন মজুরি ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। 

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে অদক্ষ শ্রমিকদের বেতন ১৩ হাজার ৬৯০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের জন্য তা ১৬ হাজার ৮৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ২০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের যে দাবি বিক্ষোভকারীরা তুলেছিলেন, তা সরকার প্রত্যাখ্যান করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে নয়ডার এই শ্রমিক আন্দোলন উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি