শিক্ষা বিস্তার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বেকারত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আর্থসামাজিক সমস্যা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দক্ষতার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং শ্রমবাজারের চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্যের কারণে এই সমস্যা দিনের পর দিন আরও জটিল হয়েছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যখন কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন এই বেকারত্বের সমস্যায় ভুগছে। বেকারত্ব দূরীকরণে শিক্ষা বিস্তার ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সরকারি জরিপ অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ৪.৬৩ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ২৭.৪ লাখ মানুষ এই মুহূর্তে কর্মহীন এবং এ সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। [১] এছাড়া দেশের যুব বেকারত্ব হার জাতীয় গড় বেকারত্বের তুলনায় অনেক বেশি। ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (ILO) অনুযায়ী বাংলাদেশের যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০.৬ শতাংশ, যা সাধারণ বেকারত্ব হার (৪.২ শতাংশ) থেকে দ্বিগুণের বেশি। এ পরিস্থিতিতে প্রতি বছর প্রায় ২২ ২৩ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, কিন্তু নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরির হার এর তুলনায় কম। 

এই বাস্তবতা শিক্ষা বিস্তার, দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের তাগিদ দেয়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, বরং শিক্ষা বিস্তার, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মাঝে প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়িত্ব ছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা বেকারত্ব নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

বেকারত্ব দূরীকরণে শিক্ষার ভূমিকা 

শিক্ষা সমাজের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এটি ব্যক্তিগত ও জাতীয় উভয় স্তরেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষভাবে দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি তার কাজ সম্পর্কে জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে, যা তাকে কর্মে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত করে তোলে। শ্রমবাজারের বিস্তৃতি ও চাহিদা সম্পর্কেও শিক্ষিতরা অবগত থাকে এবং তা অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করে তোলে। তাছাড়া আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিই বর্তমানে উদ্যোক্তা হচ্ছেন। নিজেদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সুযোগ তৈরি করছেন। শিক্ষা নতুন প্রযুক্তি এবং যুগের সঙ্গে পরিবর্তিত শ্রম বাজারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য মানুষকে সক্ষম করে তোলে। 

শিক্ষা বিস্তারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

দেশের প্রতিরক্ষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা কেবল সীমান্ত পাহারা বা যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিরক্ষার পাশাপাশি বহুমাত্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় অবদান রেখে চলেছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে। এর মধ্যে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস ও আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও শিক্ষার প্রসার

প্রথমত, শিক্ষা বিস্তারে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ ও শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজ ও আর্মি পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, নেতৃত্বগুণ ও দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ করে তুলছে, যা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে তাদের সাফল্যের ভিত্তি রচনা করে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত, নৈতিকতাবোধসম্পন্ন ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সারা দেশে বিস্তৃত পরিসরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রচলিত সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও বিশেষায়িত ধারার প্রতিষ্ঠান; এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রশিক্ষক ও সহায়ক কর্মী কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ করেছেন এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে সাফল্যের সঙ্গে কর্মরত থেকে জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখছে। সেনাবাহিনী পরিচালিত ৪৪টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ এবং ১৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কলেজের পাশাপাশি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অধীনে পরিচালিত ১৫টি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; তদুপরি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ১২টি ক্যাডেট কলেজ জাতীয় শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে এবং বিমান ও নৌবাহিনী পরিচালিত স্কুল-কলেজসমূহও সমানভাবে অবদান রেখে চলেছে। উল্লেখযোগ্য যে, এসব প্রতিষ্ঠান কেবল বাহিনী সদস্যদের সন্তানদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্থানীয় অভিভাবকদের কাছেও শৃঙ্খলাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রচনা করছে। 

একুশ শতকের সূচনালগ্নে প্রকৌশল শিক্ষা বিস্তার ও কারিগরি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ঢাকার মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। অল্প সময়ের মধ্যেই এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়; অনেকেই বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, আবার কেউ কেউ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা ও গবেষণায় নিয়োজিত। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সৈয়দপুর, কাদিরাবাদ, কুমিল্লা ও খুলনায় আরও কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ব্যবসায় শিক্ষা ও পেশাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় মিরপুর সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এবং সাভার ও সিলেটে চালু হয় আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। চিকিৎসা শিক্ষার প্রসারেও গড়ে ওঠে আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ, যার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত হয়েছে একাধিক আর্মি মেডিক্যাল কলেজ ও আর্মি নার্সিং কলেজ, যেখানে নার্সিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত, আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে একটি সচেতন, দক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রজš§ গঠনের ভিত্তি সুদৃঢ় করছে।

সেনা পরিবার কল্যাণ সমিতি (সেপকস) সেনাসদস্যদের সহধর্মিণীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি মানবকল্যাণমূলক সংগঠন, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনটি নারীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে হস্তশিল্প, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সেলাই ও ফ্যাশন ডিজাইন, খাদ্য প্রস্তুত ও রন্ধনশিল্পসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সাহস ও আত্মবিশ্বাস লাভ করছেন, যা তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হচ্ছে। সেপকসের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত প্রয়াস স্কুল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে এক অনন্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। এখানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক বিশেষায়িত পাঠদান, থেরাপি ও জীবনদক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়, যাতে তারা সমাজে মর্যাদার সঙ্গে স্বাবলম্বী জীবন যাপন করতে সক্ষম হয়। ফলে বলা যায়, সেপকসের এসব কার্যক্রম নারী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং সামগ্রিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর অবদান 

দেশের প্রতিরক্ষা দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। পদক্রম অনুযায়ী প্রায় দেড় লাখ সামরিক সদস্য ও প্রায় ১৩ হাজার বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কাজ করেন।[৪] প্রতি বছর নিয়মিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৈনিক, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং কমিশন্ড অফিসার পদে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী যোগদানের সুযোগ পান। এর পাশাপাশি বেসামরিক খাতে বিভিন্ন পেশাজীবীও নিয়োগপ্রাপ্ত হন, যা জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্ব হ্রাসে প্রত্যক্ষ ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে। প্রত্যক্ষ নিয়োগ, প্রশিক্ষণভিত্তিক দক্ষ মানবসম্পদ গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মাধ্যমে সেনাবাহিনী বহুমাত্রিকভাবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত করছে। এর ফলে শুধু বাহিনীর সদস্যরাই নয়, অসংখ্য বেসামরিক নাগরিকও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকার সুযোগ পাচ্ছেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। (বাকি অংশ পরবর্তী সময়)

লেখক: সেনা কর্মকর্তা