নির্বাচনে মনোনয়নের পর

বিশাল নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপাল নির্বাচনে মিস্টার জন টি স্মিথ এবং মিস্টার ব্ল্যাংক জে ব্ল্যাংকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কয়েকমাস আগে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। যেকোনো কারণেই আমার মনে হচ্ছিল যে, এই ভদ্রলোকদের তুলনায় আমার একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। সেটি আমার ‘ভালো চরিত্র’। পত্রিকার খবর থেকে সহজেই জানা যায়, যদি কোনো সময় তাদের কোনো সুনাম থেকেও থাকে, এখন সেটি নেই। পরবর্তী বছরগুলোতে তারা সবধরনের ঘৃণ্য অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে যে মুহূর্তটিতে আমি আমার এই সুবিধাটির কথা ভেবে উল্লসিত হচ্ছিলাম এবং গোপনে খুশি হচ্ছিলাম, তখন আমার এই খুশির গভীর অন্তঃস্থলে একধরনের অস্বস্তিও অনুুরণিত হচ্ছিল। কারণ ওই ধরনের লোকদের সাথে জড়িয়ে আমার নামও শোনা যাচ্ছিল। এই বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত অস্থির করে তুলল। অবশেষে আমি আমার দাদিকে বিষয়টি জানিয়ে একটি চিঠি লিখলাম। তিনি দ্রুত উত্তরে জানালেন :

সারা জীবনে তুমি লজ্জিত হবার মতো কোনো কাজই করোনি, একটিও না। খবরের কাগজের দিকে তাকিয়ে দেখ এবং বোঝার চেষ্টা করো মিস্টার স্মিথ এবং ব্ল্যাংক কী ধরনের চরিত্রের লোক ছিলেন এবং তারপর ভেবে দেখ নিজেকে তাদের পর্যায়ে নামিয়ে তাদের সাথে জনগণের সামনে দাঁড়িয়ে ভোট চাইবে কি-না।

ঠিক একই কথা আমিও ভাবছিলাম! সেই রাতে একমুহূর্তও আমি ঘুমাতে পারিনি। তবে তাই বলে আমি তো পিছিয়ে আসতে পারি না!

তবে আমি প্রতিশ্রুতবদ্ধ এবং অবশ্যই আমাকে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সকালের নাস্তা খেতে খেতে আনমনা হয়ে খবরের কাগজের পাতায় চোখ বুলাচ্ছিলাম, এমন সময় এই টুকরা খবরটা আমার চোখে পড়ল; আর সত্যি বলতে কি, সাথে সাথে এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি আর কখনো হইনি।

মিথ্যা হলফ। যেহেতু মিস্টার মার্ক টোয়েন এখন গভর্নর পদের একজন প্রার্থী হিসেবে জনগণের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, কাজেই তিনি হয়তো নিজেকে অবনমিত করে ব্যাখ্যা করবেন যে, কী কারণে কোচিন চায়নার ওয়াকাওয়াকে চৌত্রিশ জন সাক্ষী তাঁকে মিথ্যা বিবৃতি প্রদানের কারণে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ওই মিথ্যা হলফের অভিপ্রায় ছিল একজন গরিব নেটিভ বিধবা এবং তার অসহায় পরিবারের একমাত্র সামান্য সম্বল একটি কলাগাছের জমি গ্রাস করা। এই জমিটি ছিল তাদের মৃত্যুশোক ও ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচার একমাত্র অবস্থান ও সম্বল। মিস্টার টোয়েনের নিজের কাছে এবং সেই সাথে যাদের কাছে ভোট চাইছেন সেই বিশাল জনগণের প্রতি দায় হিসেবে এই বিষয়টি সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা তাঁর দেওয়া দরকার। তিনি কি তা করবেন?

মনে হচ্ছিল প্রচণ্ড বিস্ময়ে আমি ফেটে পড়ব! কীরকম নিষ্ঠুর এবং হূদয়হীন একটা অভিযোগ! আমি জীবনেও কোচিন চায়না দেখিনি! কখনো ওয়াকাওয়াকেরও নামও শুনিনি! একটা কলাবাগান আর ক্যাঙ্গারুর মাঝে তফাত্ও আমি জানি না! বুঝতে পারলাম না কী করব। একজন দিশাহারা মানুষের মতো অসহায় হয়ে বসে রইলাম। কিছু না করেই সারাদিন কাটিয়ে দিলাম। পরদিন সকালে আবার একই পত্রিকায় এই খবরটা এল—আর কিছু না :

বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ—দেখা যাচ্ছে যে, মিস্টার টোয়েন কোচিন চায়না সম্পর্কিত অভিযোগ সম্পর্কে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে চুপ করে রয়েছেন।

[স্মারক—এরপর নির্বাচনের প্রচারাভিযান চলার শেষ সময় পর্যন্ত এই পত্রিকাটি যেকোনোভাবেই হোক আমাকে ‘কুখ্যাত মিথ্যা হলফপ্রদানকারী টোয়েন হিসেবে উল্লেখ করেছিল]

তারপর দি গেজেট এল, এই প্রতিবেদনটি নিয়ে :

জানতে চাই—নতুন গভর্নর পদপ্রার্থী কি দয়া করে তার কিছু বন্ধু-নাগরিকবৃন্দকে (যারা তাকে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন!) ব্যাখ্যা করবেন যে, মন্টানায় তার কেবিন-মেটের প্রায়ই ছোটোখাটো মূল্যবান জিনিস হারাত এবং অবশেষে জিনিসগুলো মিস্টার টোয়েনের কাছে অথবা তার ট্রাংকে পাওয়া যেত (চোরাই মালগুলো তিনি খবরের কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছিলেন) এবং এরপর তারা তার ভালোর জন্যই তাকে বন্ধুসুলভ ভর্ত্সনা করতে বাধ্য হয় এবং গায়ে আলকাতরা আর পাখির পালক মেখে শাস্তি দিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়েছিল। আর বলেছিল ক্যাম্পে তার স্থানটি যেন স্থায়ীভাবে খালি রাখা হয়। এই বিষয়টি সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা কি তিনি করবেন?

এরচেয়ে বেশি ইচ্ছাকৃত বিদ্বেষপূর্ণ অভিযোগ আর কিছু কি হতে পারে? কারণ আমি জীবনে কখনো মন্টানায় ছিলাম না।

[এরপর থেকে এই পত্রিকাটি আমার কথা বলতে গেলেই ‘মন্টানার চোর, টোয়েন’ হিসেবে উল্লেখ করত]

এরপর থেকে পত্রিকা হাতে তুলে নিতে গেলে বেশ উত্কণ্ঠিত হয়ে পড়তাম—ঠিক যে রকম কেউ তার পছন্দের কম্বলটি তুলতে গিয়ে ভাবত যে, এর নিচে হয়তো একটা র্যাটল সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে। তারপর একদিন এটা  চোখে পড়ল :

মিথ্যা প্রমাণিত হলো—ফাইভ পয়েন্টের মাইকেল ও’ফ্ল্যানাগান, এসকোয়ার... এবং ওয়াটার স্ট্রিটের মিস্টার স্নাব র্যাফের্টি এবং মিস্টার ক্যাটি মুলিগানের শপথপূর্বক লিখিত হলফনামা থেকে; এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে মিস্টার মার্ক টোয়েনের কুিসত বিবৃতি যে, আমাদের মহান আন্দোলনের প্রধান নেতার প্রয়াত পিতামহ ব্ল্যাংঙ্ক জে. ব্ল্যাংককে হাইওয়েতে ডাকাতির জন্য ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, এটি একটি নিষ্ঠুর এবং ভিত্তিহীন মিথ্যাকথন, এতে সত্যের লেশমাত্র ছায়া নেই। সত্ মানুষের জন্য এটা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক, যখন তারা দেখেন যে রাজনৈতিক সাফল্য অর্জনের উদ্দেশ্যে এধরনের লজ্জাজনক পথ অবলম্বন করা হয়, কবরে যারা শুয়ে রয়েছেন, তাদের ওপর আক্রমণ করা হয় এবং মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাদের গৌরবময় নামকে কলুষিত করা হয়।

যখনই আমরা ভাবি যে, এই কদর্য মিথ্যাকথনের কারণে মৃতব্যক্তির নিরপরাধ আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব কীরকম নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন, তখন জনমতকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করার কারণে, আমরা অপমানিত জনগণকে এই কলঙ্ক রটনাকারীর বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রায় প্ররোচিত হয়ে পড়ি। কিন্তু না! চলুন তাকে আমরা তার ছিন্ন বিবেকের তীব্র যন্ত্রণার কাছে ছেড়ে দেই (তবে অনুভূতির বহিঃপ্রকাশের কারণে লোকজন যদি রাগে ফেটে পড়ে এবং ক্রোধাবস্থায় ওরা যদি কলঙ্ক রটনাকারীর কোনো দৈহিক ক্ষতিসাধন করে, সেক্ষেত্রে স্পষ্টতই কোনো জুরিই দোষী সাব্যস্ত করতে পারবে না এবং কোনো আদালতই এই অন্যায় সাধনকারীদের শাস্তি দিতে পারবে না)।

শেষ বাক্যটির উদ্ভাবনকুশলতা আমাকে সেই রাতে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করল—যখন ‘উত্তেজিত ও অপমানিত জনতা’ সামনের দরজা দিয়ে তরঙ্গের মতো ঢুকে পড়ল এবং ঢোকার সময় আসবাব ও জানালাসহ হাতের কাছে যা পেল ভেঙে চলল। আবার চলে যাওয়ার সময় যা যা নিতে পারল নিয়ে চলে গেল। অথচ আমি বাইবেলে হাত রেখে শপথ করে বলতে পারি যে, অমি কখনো মিস্টার ব্ল্যাংকের পিতামহের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করিনি। তাছাড়া, আমি কোনোদিন তার নামও শুনিনি বা সেই দিন-তারিখ পর্যন্ত তার কথা কোথাও উল্লেখও করিনি।

[চলে যাওয়ার আগে, আমি নিবেদন করতে চাই যে, উল্লিখিত সংবাদপত্রটি এরপর থেকেই আমাকে লাশচোর বা টোয়েন দি বডি-স্নেচার নামে উল্লেখ করত।]

দৈনিক পত্রিকার পরবর্তী যে প্রতিবেদনটি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, তা ছিল নিম্নরূপ :

একজন আকর্ষণীয় পদপ্রার্থী—গতরাতে স্বতন্ত্র প্রাথীদের একটি জনসভায় মিস্টার মার্ক টোয়েনের একটি শ্বাসরুদ্ধকর বক্তৃতা দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সময়মতো আসেননি! তার চিকিত্সকের কাছ থেকে পাঠানো একটি টেলিগ্রাম থেকে বলা হয়েছে যে, একটি পলাতক দলের ধাক্কায় তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং তার পা দুই জায়গায় ভেঙেছে। তিনি বিছানায় শুয়ে তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি এরকম আরো অনেক অর্থহীন কথা। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই বিশ্রী ধোঁকাবাজিটা হজম করার খুব চেষ্টা করলেন, এবং এমন ভান করলেন যেন তারা জানেন না যে, ওই নষ্টচরিত্রের জীবটির অনুপস্থিতির আসল কারণটা কী, যাকে তারা তাদের পতাকাবাহী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গতরাতে একজন লোককে পশুর মতো নোংরা মাতাল অবস্থায় এলোমেলো পায়ে টলতে টলতে মিস্টার টোয়েনের হোটেলে ঢুকতে দেখা গিয়েছিল। এখন এটা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রমাণ করার আশুকর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মদের ঘোরে আচ্ছন্ন এই পশুতুল্য লোকটি স্বয়ং মার্ক টোয়েন নন। অবশেষে আমরা তাদেরকে পেয়েছি! এটা এমন এক বিষয়, যা এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই। জনতা বজ্রকণ্ঠে জানার দাবি করছে যে, ‘ওই লোকটি কে ছিল?’ 

এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার, পুরোপুরি অসম্ভব। কেননা একমুহূর্তের জন্য হলেও আসলে এটা আমারই নাম, যা এই ঘৃণ্য সন্দেহের সাথে জড়ানো হয়েছিল। অথচ গত দীর্ঘ তিনটি বছর ধরে আমি কোনো ধরনের মদ, বিয়ার বা লিকার স্পর্শ করিনি।

[এতে বোঝা গেল—সময় আমার ওপর কী ধরনের প্রতিক্রিয়া করছে, যখন আমি নিজে বলছি যে, স্বয়ং আমি দেখলাম, যে পত্রিকার পরবর্তী সংষ্করণে কোনো অনুশোচনা ছাড়াই নিশ্চিতভাবে আমাকে ‘মদের ঘোরে প্রলাপ বকা মিস্টার টোয়েন বা ডেলিরিয়াম ট্রেমেন্স টোয়েন’ নাম দেওয়া হয়েছে এবং আমি জানতাম যে, একটানা বিশ্বস্ততার সাথে পত্রিকাটি একেবারে শেষ পর্যন্ত এই নামেই আমাকে সম্বোধন করবে।]  

ইতোমধ্যে বেনামি চিঠি আসাটা আমার চিঠিপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়াল। এগুলো সাধারণত এরকম ছিল—

ওই বুড়ি মহিলার ব্যাপারটা কী হলো, যে ভিক্ষা করছিল আর যাকে আপনি আপনার বাড়ির চৌহদ্দি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পিওএল. প্রাই.।

আর এটা :

আর আপনি এমন কিছু কর্ম করেছেন, যা আমি ছাড়া আর কারও জানা নেই। আপনার জন্য ভালো হয় যদি নিজের সততা প্রমাণের জন্য কিছু একটা করেন, আর নয়তো পত্রিকা মারফত আপনি আরো কিছু শুনতে পারবেন—হ্যান্ডি অ্যান্ডি।—এরকমই ছিল ব্যাপারগুলো। এগুলো আমি আরো চালিয়ে যেতে পারতাম, যতক্ষণ না পাঠকের বিতৃষ্ণা ধরে এবং যদি তা বাঞ্ছনীয় হয়।

শীঘ্রই প্রধান রিপাবলিকান পত্রিকাটি পাইকারিভাবে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার কারণে আমাকে ‘দোষী’ সাব্যস্ত করল আর অগ্রগণ্য ডেমোক্রেটিক পত্রিকাটি আমার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইলের অত্যন্ত গুরুতর একটি মামলা ‘ঠুকে’ দিলো।

[এভাবে আমি আরো দুটি নতুন নাম অর্জন করলোম—‘নোংরা দুর্নীতিবাজ টোয়েন’ এবং ‘জঘন্য সুযোগসন্ধানী টোয়েন’।]

আমার বিরুদ্ধে যে-সকল ভয়ঙ্কর অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেগুলোর একটি ‘উত্তরের’ জন্য এমনভাবে চেঁচামেচি শুরু হলো যে, আমার দলের সম্পাদক ও নেতৃবৃন্দ বললেন, আর চুপ করে থাকাটা আমার জন্য রাজনৈতিক বিনাশ বা গুরুতর ক্ষতি হবে। যেন তাদের সনির্বন্ধ অনুরোধকে অবশ্যপালনীয় করার জন্য, ঠিক তার পরদিনই একটি পত্রিকায় নিম্মলিখিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো :

ওই লোকটিকে দেখুন!—স্বতন্ত্র প্রার্থীটি এখনো নীরবতা বজায় রেখেছেন। কেননা তার কথা বলার সাহস নেই। তার বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ ভালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে আর এগুলো তার নিজের মৌনতা দিয়ে অনুমোদিত ও পুনঃঅনুমেদিত হয়েছে; আজ পর্যন্ত তিনি চিরদিনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে রয়েছেন। হে স্বতন্ত্রীরা, আপনাদের প্রার্থীর দিকে তাকান এবং বিবেচনা করুন! ওই কুখ্যাত মিথ্যা হলফকারীকে দেখুন! মন্টানার চোর! লাশ-চোর! আপনাদের মদের ঘোরে প্রলাপকারীকে নিবিষ্টভাবে অবলোকন করুন! আপনাদের জঘন্য দুর্নীতিবাজ! আপনাদের জঘন্য সুযোগসন্ধানী! দেখুন তার দিকে, ভালোভাবে বিবেচনা করুন এবং তারপর বলুন যে, আপনারা আপনাদের নিষ্কপট ভোট এমন একটি প্রাণীকে দিতে পারেন কি-না, যে তার ভয়ানক অপরাধের কারণে এই বেদনাদায়ক খেতাবগুলো অর্জন করেছে আর এই অভিযোগগুলোর একটিও অস্বীকার করে একবারও মুখ খোলার চেষ্টা করেনি!

এখান থেকে বের হওয়ার সম্ভাব্য আর কোনো পথ ছিল না; আর তাই অত্যন্ত গভীর অবমাননায়, এই পুঞ্জীভূত  ভিত্তিহীন অভিযোগ এবং ঘৃণ্য ও অন্যায় মিথ্যাকথনের ‘জবাব’ দেবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। তবে কাজটা আমি কোনোদিনই শেষ করতে পারিনি, কেননা ঠিক পরদিনই একটি পত্রিকা নতুন একটি ভয়াবহ ও গুরুতর অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে এনে জানাল যে, সমস্ত বাসিন্দাসহ একটি মানসিক হাসপাতাল আমি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। কারণ তা নাকি ছিল আমার বাড়ি থেকে বাইরের দৃশ্য দেখায় প্রতিবন্ধক। এটা আমাকে একধরনের আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিলো। তারপর এল সম্পত্তি আত্মসাত্ করার উদ্দেশ্যে আমার চাচাকে বিষপ্রয়োগের অভিযোগ। আর সেই সাথে একটি অপরিহার্য দাবি যে, তার কবর খনন করা উচিত। এই ব্যাপারটা আমাকে উন্মত্ততার শেষপ্রান্তে তাড়িয়ে নিল। তদুপরি আমার ওপর অভিযোগ আনা হলো যে, একটি শিশুসদনের তত্ত্বাবধায়ক থাকাকালীন আমি আমার অনুপযুক্ত ও ফোকলা বুড়ো আত্মীয়দেরকে ওই শিশুসদনের খাবার তৈরি করার কাজে নিযুক্ত করেছিলাম। এবার আমি অনেকটা দোদুল্যমান হয়ে পিছু হটতে শুরু করলাম। এবং অবশেষে, দলীয় বিদ্বেষের মাধ্যমে আমাকে যে ধরনের লজ্জাকরভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল, তার চরম পরিণতি হিসেবে, ছেঁড়া পোশাকপরা বিভিন্নবর্ণের নয়টি শিশুকে শিখিয়ে দেওয়া হলো, যাতে ওরা একটি জনসভার মঞ্চে টলমল পায়ে ছুটে এসে চারদিক থেকে আমার পা জড়িয়ে ধরে আমাকে বাবা বলে ডাকতে শুরু করল!

ব্যাস এবার আমি ক্ষান্ত হলাম। আমার প্রতীক টেনে নামিয়ে আত্মসমর্পণ করলাম। নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের পদে নির্বাচনের প্রচারাভিযান চালাবার মতো উপযুক্ততা আমার নেই। অতএব আমি আমার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নোটিশ পাঠালাম এবং তিক্ততার সাথে সাক্ষর করলাম—‘আপনার একান্ত, এককালে একজন সজ্জন ব্যক্তি, তবে এখন

‘মার্ক টোয়েন, এল.পি., এম.টি., বি.এস., ডি.টি, এবং এল.ই।’

(এই গল্পটি ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক দলের জন টি. হফম্যান এবং রিপাবলিকান দলের পদপ্রার্থী স্টুয়ার্ট লিন্ডনের মাঝে নিউ ইয়র্কের গভর্নর পদে নির্বাচনের কিছু সময় পর সর্বপ্রথম ১৮৭০ সালের ডিসেম্বরে গ্যালেক্সি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। লাইব্রেরি অব আমেরিকা অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে গল্পটি বার বার প্রকাশিত হয়েছিল, তবে প্রায়ই পদপ্রার্থীদের নাম পরিবর্তন করে জন টি.স্মিথ এবং ব্ল্যাংক জে. ব্ল্যাংক নামে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে আগ্রহের বিষয় হলো ১৯৪৯ সালে পিপলস রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হবার পর গল্পটি বেশ কয়েকযুগ ধরে চীনা স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে ব্যাপকহারে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘গল্পটির রচনারীতি বা ভাব সম্পর্কে কিছু বিবেচনা করার আগে শিক্ষকদেরকে গল্পটির পুঁজিবাদ বিরোধী বার্তাটির ওপর জোর দিতে বলা হয়েছিল।’