রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি বইটি লিখেছেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিলনকান্তি বিশ্বাস। এটি ২০২৩ সালে দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমেই বইটি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে হয়। উপহারের যেকোনো জিনিসের কদর বেশি থাকে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ বইমেলায় আমার জন্য দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রায় ৩০টি বই বয়ে এনেছেন অগ্রজপ্রতিম বন্ধু, দে’জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার শুভকংকর দে (ডাকনাম অপু)। পরে মনে হলো, বইগুলোর তালিকা করে ভুলই করলাম কিনা জানি না।
বই আনার কথা শুনে আমার স্বামী স্বপন সরকার বললেন, তুমি কিন্তু বইয়ের মূল্য পরিশোধ করো। কিন্তু অগ্রজপ্রতিম বন্ধু অপু কোনো টাকা-পয়সা নিলেন না। বললেন, কোনো সময় প্রতিষ্ঠিত হলে কত বই দাম দিয়ে কিনতে পারবে! আমি মনে মনে ভাবছি, এত বই বিনামূল্যে কলকাতার কোনো প্রকাশক আমার জন্য নিয়ে এলেন—এ এক পরম পাওয়া, পরম সৌভাগ্য। আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি বই উপহারদাতা তিনজন; এর মধ্যে অগ্রজপ্রতিম বন্ধু অপু একজন। তার কাছে সবসময়ই চিরকৃতজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন তাঁরই ছোট ভাই মুন্না, বাবাই দা, নাট্যকার ও অধ্যাপক শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের নিয়ে অনেক স্মৃতি রয়েছে। বইমেলায় বইগুলো সারাক্ষণ বয়ে বেড়িয়েছে মুন্না ভাইয়া; তাঁর হাত লাল হয়ে গেছে, তবুও তিনি বিরক্ত হননি। পরে মনে হলো, কোনো স্টলে রেখেও তো আমরা ঘুরতে পারি। পরবর্তীতে কবি প্রকাশনীর স্টলে রেখে আমরা চারজন বইমেলায় ঘুরাঘুরি করলাম। প্রায় ৩০টি বইয়ের মধ্যে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মিলনকান্তি বিশ্বাসের ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থটি পড়ে মনে হয়েছে, রিভিউ করলে অন্য এক রবীন্দ্রভুবন খুঁজে পাব। মিলনকান্তি বিশ্বাসের লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লোকসংস্কৃতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো চিহ্নিত করার প্রয়াসকে পাঠকমহলে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। আজ পঁচিশে বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।
রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি গ্রন্থটি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য, চিন্তা ও জীবনদর্শনের সঙ্গে বাংলার লোকসংস্কৃতির গভীর সম্পর্ককে অনুসন্ধান করে। বাঙালির হাজার বছরের লোকঐতিহ্য, লোকগান, লোকবিশ্বাস, লোককথা, ব্রত, পালা কিংবা গ্রামীণ জীবনবোধ রবীন্দ্রচিন্তার অন্তঃসলিলা স্রোত হিসেবে কীভাবে কাজ করেছে, তার একটি বিশ্লেষণধর্মী পাঠ এ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কেবল বিশ্বমানবতার কবি নন; তিনি ছিলেন বাংলার মাটি, মানুষ ও লোকজ সংস্কৃতিরও এক নিবিড় অন্বেষক। তাঁর সাহিত্যকর্মে যে লোকজ চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ লক্ষ করা যায়, তা বাংলা সংস্কৃতির শিকড়সন্ধানী অধ্যয়নে নতুন তাৎপর্য বহন করে। মিলনকান্তি বিশ্বাস তাঁর গবেষণামূলক আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যভুবনে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য, প্রভাব ও পুনর্নির্মাণের দিকগুলোকে সুস্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছেন। ফলে গ্রন্থটি শুধু রবীন্দ্রগবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলা লোকসংস্কৃতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অধ্যাপক ও গবেষক মিলনকান্তি বিশ্বাস তাঁর এ গ্রন্থটিতে ১৩টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। প্রবন্ধগুলো হলো: রবীন্দ্রনাথ: বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক, রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে বঙ্গে লোকসংস্কৃতি চর্চা, রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য: প্রসঙ্গ ও অনুসঙ্গ, রবীন্দ্রনাথের গ্রাম-উন্নয়ন ও গ্রাম পুনর্গঠনের প্রয়াস, রবীন্দ্র সাহিত্যে সমন্বয় ভাবনা: প্রেক্ষিত বাউল গান, রবীন্দ্রনাটক: লোকসংস্কৃতির উপাদান, রক্তকরবী: লোকসংস্কৃতির আলোকে, শারদোৎসব: লোকসংস্কৃতির অনুষঙ্গ, রবীন্দ্রনাথ: রথযাত্রা ও রথের রশি, রবীন্দ্রনাথের ছেলেভুলানো ছড়া: একটি ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি: গবেষণা ও চর্চার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের লোকসংস্কৃতি-চর্চা: একালের প্রেক্ষিতে, লোকসংস্কৃতি-চর্চায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অবদান ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল সত্তা কেবল উচ্চমার্গীয় সাহিত্য বা ধ্রুপদী ধারায় সীমাবদ্ধ ছিল না; লোকজ ঐতিহ্যের গভীরেও তাঁর অবাধ বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। মিলনকান্তি বিশ্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, কবির কাছে লোকসংস্কৃতি ছিল একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান উৎস, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার সংস্পর্শে নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। কেবল নিজের সৃষ্টির প্রয়োজনে নয়, জাতীয় সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন এবং তৎকালীন তরুণ প্রজন্মকে বিলুপ্তপ্রায় অমূল্য উপাদানগুলো সংগ্রহের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত ও অনুপ্রাণিত করেছিলেন। গ্রামবাংলার ছড়া, গান ও লোককথাকে তিনি সাহিত্যের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, উদ্ধৃতিটিতে তা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
রবীন্দ্রনাথ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ফলে তাঁর সৃষ্টির ও কর্মের জগৎ ছিল বহু ধারায় প্রবাহমান। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দৃষ্টি থেকে লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা এড়িয়ে যায়নি। আর পাঁচটি বিষয়ের মতো লোকসংস্কৃতির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা তাঁর দৃষ্টিতে সেদিন ধরা পড়েছিল। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন এবং তৎকালীন একদল তরুণ সম্প্রদায়কে এই উপাদান সংগ্রহের কাজে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করেছিলেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ১২)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লোকসংস্কৃতি-কেন্দ্রিক প্রয়াসটি সমকালীন জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক চেতনার পুনর্জাগরণে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। তৎকালীন আধুনিক শিক্ষিত সমাজ যখন পাশ্চাত্য অনুকরণে মগ্ন, তখন গ্রামীণ ব্রতকথা বা লোকগীতির গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং তরুণদের সে কাজে নিয়োজিত করা তাঁর সুদূরপ্রসারী দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। এর ফলে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক সম্পদগুলো কেবল বিলুপ্তির হাত থেকেই রক্ষা পায়নি, তা আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর এই পৃষ্ঠপোষকতা লোকজ উপাদান ও আধুনিক মননশীলতার মধ্যে একটি সুষম মেলবন্ধন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনদর্শনে বাউলের সহজিয়া তত্ত্ব ও লোকসংগীতের গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীনের ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকা লেখা এবং তাঁকে লোকসংগীত সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমে কবির লোকসংস্কৃতিপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। বিশেষ করে গগন হরকরা বা লালন শাহের মতো সাধকদের দর্শনে তিনি ‘মনের মানুষ’ বা আধ্যাত্মিক সংযোগের যে সন্ধান পেয়েছিলেন, তা তাঁর ‘দ্য রিলিজিয়ন অব ম্যান’সহ বিভিন্ন প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বাউল গানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল বেশি। মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন কর্তৃক সংকলিত ‘হারামণি’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি বলেন, “মুহাম্মদ মনসুরউদ্দীন বাউল সংগীত সংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়েছেন… আমিও তাঁকে অন্তর থেকে উৎসাহ দিয়েছি” (উদ্ধৃত: শেখ মকবুল ইসলাম, ২০০৭)।
লোকায়ত বাউল গানকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে উচ্চাঙ্গের দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর লেখনীর মাধ্যমেই অবহেলিত বাউল সাধকদের জীবনবোধ আন্তর্জাতিক পরিসরে মর্যাদা লাভ করে।
দেশ-বিদেশ ভ্রমণের ফলে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। শান্তিনিকেতন আশ্রমের শিক্ষাধারায় সংগীত, চিত্র ও নৃত্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। দেশ-বিদেশের লোকনৃত্যশিল্পীদের তিনি সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ১৯)।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষায় তিনি রাখিবন্ধন উৎসব প্রবর্তন করেন। সৌভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে এটি আজও পালিত হয়। লোকসংস্কৃতির উপাদান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ছাড়াও তিনি পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে শিক্ষিত সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ২৪)।
ছেলেভুলানো ছড়ার বৈশিষ্ট্য হলো তার স্বতঃস্ফূর্ততা, কল্পনানির্ভরতা এবং অসংলগ্নতা। ‘যমুনাতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে’ ধরনের ছড়ায় ধারাবাহিক কাহিনি না থাকলেও তা শিশুমনে আনন্দ সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথ একে ‘অসংগত’ বললেও এই অসংগতিই শিশুমনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন (মিলনকান্তি বিশ্বাস, ২০২৩: ৪৩)।
মিলনকান্তি বিশ্বাসের এ বক্তব্যের সমর্থনে বলা যায়, শিশুসাহিত্যের উদ্দেশ্য সবসময় সুসংবদ্ধ কাহিনি নির্মাণ নয়; সেইসাথে শিশুর কল্পনাশক্তিকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। ছেলেভুলানো ছড়ায় যে বিচ্ছিন্নতা লক্ষ করা যায়, তা মূলত শিশুমনের স্বাধীন ভাবনারই ভাষারূপ। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মন যেখানে যুক্তি ও বাস্তবতার কাঠামোয় নিয়ন্ত্রিত, শিশুমন সেখানে ধ্বনি, ছন্দ ও চিত্রকল্পের খেলায় নিমগ্ন থাকে। তাই এসব ছড়ায় সংলগ্নতার অভাব থাকলেও শিশুর কাছে তা স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বরং এই আপাত অসংগতি শিশুর সৃজনশীলতা ও কল্পনাবোধকে আরও প্রসারিত করে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ‘অসংগত’ মন্তব্যটি ছড়ার সীমাবদ্ধতার পরিবর্তে শিশুমনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকেই অধিকতর উন্মোচিত করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা দর্শনের মূলে ছিল যান্ত্রিকতার বেড়াজাল ভেঙে শিশুকে প্রকৃতির অবারিত প্রাঙ্গণে ফিরিয়ে নেওয়া। উদ্ধৃতিটির বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রাচীন তপোবন ব্যবস্থার আদর্শকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে পুনর্জীবিত করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণ নয়, বরং প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে আত্মার মুক্তি ও বোধের জাগরণ। উদ্ধৃতিটিতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে যে, চার দেয়ালের বদ্ধ শ্রেণিকক্ষ শিশুর সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই ‘প্রকৃতিই প্রকৃত শিক্ষক’ এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তিনি শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে আকাশ, বাতাস এবং ঋতু বৈচিত্র্য পাঠ্যপুস্তকের সমান গুরুত্ব পায়। এটি ছিল এমন এক শিক্ষা পদ্ধতি যেখানে শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমন্বয় ঘটে নিবিড় প্রাকৃতিক সান্নিধ্যে। রবীন্দ্রনাথের বিপুল কর্মকাণ্ডের মধ্যে এ ব্রাহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা একটি অন্যতম প্রয়াস। সমগ্র পৃথিবীর প্রেক্ষিতে এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বলা যায়।
ভারতবর্ষের প্রাচীন তপোবন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখেই এই অভিনব শিক্ষাধারা চালু করেছেন রবীন্দ্রনাথ, শান্তিনিকেতন ব্রহ্মাচর্যাশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির কোলে বসে শিশু শিক্ষা লাভ করবে।প্রকৃতির সান্নিধ্য ব্যতীত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় না।প্রকৃতিই শিশুর প্রকৃত শিক্ষক। ( মিলনকান্তি বিশ্বাস,২০২৩: ৬০)
আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার যৌক্তিক প্রতিরক্ষা হিসেবে বলা যায়, বর্তমানের অতি-যান্ত্রিক ও ডিজিটাল যুগে রবীন্দ্রনাথের এ’ব্যতিক্রমী উদ্যোগ’ আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বা ‘চাইল্ড সাইকোলজি’ স্বীকার করে যে, উন্মুক্ত পরিবেশে পাঠদান শিশুর মানসিক চাপ কমিয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি করে এবং তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করে।
তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যখন কেবল প্রতিযোগিতামুখী হয়ে পড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের এই তপোবন-কেন্দ্রিক মডেল শিশুকে সহমর্মিতা, ধৈর্য এবং নান্দনিক বোধ শেখায়। প্রকৃতির পাঠশালায় শিশু যখন নিজের চোখে জগতকে চেনে, তখন তার শিখন প্রক্রিয়া হয় দীর্ঘস্থায়ী ও জীবনমুখী। সুতরাং, শান্তিনিকেতনের এ অভিনব শিক্ষাধারা কেবল কোনো আবেগীয় প্রচেষ্টা ছিল না,এর পাশাপাশি একটি বিজ্ঞানসম্মত ও মানবিক জীবনবোধ তৈরির শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ।
রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি-গ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, সমাজচিন্তা ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাংলার লোকঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ককে সুস্পষ্টভাবে উন্মোচন করেছে। এখানে লোকসংস্কৃতিকে কেবল গ্রামীণ মানুষের জীবনাচার হিসেবে নয়, বাঙালির সামষ্টিক আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক প্রাণময় উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে লোকগান, ছড়া, ব্রত, লোকবিশ্বাস ও গ্রামীণ জীবনবোধকে আত্মস্থ করে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ করেছেন? মিলনকান্তি বিশ্বাস তার বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা উপস্থাপন করেছেন গবেষণামূলক দৃষ্টিতে। ফলে গ্রন্থটি শুধু রবীন্দ্রগবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, বাংলা লোকসংস্কৃতি অধ্যয়নের জন্যও একটি মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক দূরদৃষ্টি ও লোকঐতিহ্যের প্রতি তাঁর দায়বোধকে অনুধাবনের ক্ষেত্রে এ বই বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
লেখক: কবি ও গবেষক।