সভ্য রাষ্ট্রের একটি বড় মানদণ্ড হইল-রাষ্ট্রটি তাহার হেফাজতে থাকা মানুষের সহিত কীরূপ আচরণ করে। কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা হয়তো অপরাধী হইতে পারেন, অভিযুক্ত হইতে পারেন, কিংবা বিচারাধীন বন্দিও হইতে পারেন; কিন্তু তাহারা কেহই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব হারান না। তাহাদের জীবনের অধিকার, চিকিৎসার অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনক হইল, শনিবার (৯ মে) ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘কারাগারে ডাক্তার ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বাড়ছে মৃত্যু’ প্রতিবেদনটিতে যেই চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে, তাহাতে প্রতীয়মান হয় যে, দেশের কারাগারগুলির এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এক গভীর ব্যর্থতার পরিচয় দিতেছে।
প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, দেশের ৭৪টি কারাগারের মধ্যে ৫৪টিতেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স নাই। অর্থাৎ, কারাগারে কোনো বন্দি হঠাৎ অসুস্থ হইলে কিংবা হৃদরোগ, স্ট্রোক অথবা গুরুতর আঘাতের মতো জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি হইলে দ্রুত হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার ন্যূনতম ব্যবস্থাও অনেক স্থানে অনুপস্থিত। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, এই সংকট মোকাবিলায় অনেক সময় লেগুনা কিংবা ভাড়ার সাধারণ যানবাহন ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের কারাগারগুলির ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৫৯০ জন। অথচ বাস্তবে বন্দিসংখ্যা প্রায় ৮০ হাজারের অধিক হইয়া থাকে। অর্থাৎ, অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যেই বন্দিরা বাস করিতেছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা আরও গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠে; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। কারা অধিদপ্তরের অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৬টি থাকিলেও বর্তমানে স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র দুই জন চিকিৎসক।
প্রশ্ন হইল, একটি দেশে যেইখানে হাজার হাজার কোটি টাকা নানা খাতে ব্যয় হয়, সেইখানে কারাগারের জন্য কয়েক ডজন চিকিৎসক ও কিছু অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করিতে বৎসরের পর বৎসর কেন অপেক্ষা করিতে হয়? বিগত শাসনামল হইতে বর্তমান আমল-সকলেই সমস্যাটির কথা জানেন। বৈঠক হইয়াছে, চিঠি চালাচালি হইয়াছে, পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব গিয়াছে; কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর। এই দীর্ঘসূত্রতা শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রাণ কাড়িয়া লইতেছে। কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা কেবল একটি তুচ্ছ সংখ্যা নহে। কারণ, প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনায় একটি পরিবার কিংবা স্বজনকে যন্ত্রণা বহন করিয়া যাইতে হয়। কোনো বন্দি যদি সময়মতো হাসপাতালে পৌছাইতে না পারার কারণে মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে তাহার দায় শুধু ভাগ্যের উপর চাপানো যায় না। ইহা প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত অবহেলা এবং মানবাধিকারেরও প্রশ্ন বটে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল-কারাগারের অধিকাংশ বন্দিই এখনো আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন নাই। বিচারাধীন বন্দিদের সংখ্যা বিপুল। অর্থাৎ, যাহাদের অপরাধ এখনো আইনি দৃষ্টিতে প্রমাণিত হয় নাই, তাহারাও অমানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার শিকার হইতেছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বাস্তবতা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
ইতিবাচক দিক এই যে, সম্প্রতি ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের অনুমোদন মিলিয়াছে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, ইহা কি যথেষ্ট? শুধু যানবাহন সংগ্রহ করিলেই সমস্যার সমাধান হইবে না। প্রয়োজন প্রতিটি কারাগারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, জরুরি ঔষধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থাপনা। কারাগারকে কেবল শাস্তির স্থান ভাবিলে চলিবে না-ইহা সংশোধন ও পুনর্বাসনের স্থানও বটে। আর কোনো মানুষকে সংশোধনের পূর্বেই অবহেলায় মৃত্যুর দিকে ঠেলিয়া দেওয়া সভ্যসমাজের পরিচয় হইতে পারে না। বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচনায় প্রায়ই কারাগারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা আড়ালে থাকিয়া যায়। অথচ রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিক চেহারা অনেক সময় এই দেওয়ালের আড়ালেই স্পষ্ট হইয়া উঠে। আমরা যদি সত্যই মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়িতে চাহি, তাহা হইলে এই ধরনের অমানবিক সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান আবশ্যক। অন্যথায় কারাগারের দেওয়ালের আড়ালে নীরবে বাড়িতে থাকিবে মৃত্যু, আর সভ্য রাষ্ট্র হইবার চেষ্টাও কেবল পরিকল্পনা আর মুখের ভালো ভালো কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকিবে।