আমাদের সংস্কৃতিতে কোরবানির ঈদ

সংস্কৃতি বা তমদ্দুন একটি জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণ। বাংলাদেশের প্রায় নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম। এ বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি যে সমস্ত উপাদান দ্বারা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে তার মধ্যে কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা অন্যতম। মুসলিম দুনিয়ায় ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আজহা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক স্থিরকৃত ঈদ হিসেবে পালিত হয়।

কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা পালিত হয় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম ‘আলায়হিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল ‘আলায়হিস সালামের কোরবানির ঘটনার স্মারক হিসেবে। বাংলাদেশে ইসলাম যেদিন এসেছে সেদিন থেকেই ইসলামি অনুশাসন ও উত্সবাদি এদেশের ইসলাম গ্রহণকারী সৌভাগ্যবান মানুষগুলো পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ তার মূল অনুশাসন বজায় রেখে আপন মহিমায় ভাস্বর, সেইসঙ্গে এর মধ্যে এক অনন্য রুচিনীতি বা সাংস্কৃতিক কাঠামো সংস্থাপিত হয়েছে যা কোরবানির মূল অনুশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষ তো ঘটায়নি বরং তাকে সমুন্নত করেছে নতুন মাত্রায় আনন্দ সৌকর্য শোভিত করে। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহতে নিবেদিত প্রাণ হওয়া। আমার সালাত ও আমার কোরবানি এবং আমার জীবন ও আমার মরণ আল্লাহ্ রব্বুল ‘আলামীনের জন্য— এ দৃঢ়প্রত্যয়ে বলীয়ান বাংলাদেশের মানুষ ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে পালন করে আসছেন।

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ আসার মাসখানেক আগে থেকেই প্রস্তুতি চলে কোরবানি দেওয়ার জন্য পশু খরিদ করার। কোরবানির পশুরহাট শহরে-নগরে বিশেষ সাজে-সজ্জিত হয়ে বসে। কোথাও কোথাও তো বিরাট বিরাট তোরণ নির্মাণ করে ও ঝালরযুক্ত সামিয়ানা টাঙিয়ে এবং আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়াও দেয়ালে দেয়ালে বিরাট বিরাট পোস্টারও টাঙানো হয়, ব্যানার, ফেস্টুন স্থাপন করা হয়। যারা পশু খরিদ করতে অপরাগ তথা দরিদ্র শ্রেণির মানুষও গোশতের ভাগ পাবেন এ আশা পোষণ করে ঈদের আনন্দকে লালন করেন। বাংলাদেশে গরু কিংবা ছাগল কোরবানি দেওয়া হয়। তবে গরু কোরবানিই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। এতে সুবিধাটা হচ্ছে সাতজনে ভাগে এটা দেওয়া যায়। গরু কোরবানির ঝোঁক বেশি থাকার আর একটি কারণ হচ্ছে—এ গরু কোরবানির কারণে এককালে এখানকার মুসলমানদের ভীষণভাবে নাজেহাল হতে হয়েছে এবং শহীদও হতে হয়েছে। আমরা যদি ব্রিটিশ আমলের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর যেসব কারণে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে গরু কোরবানি নিষিদ্ধকরণ। যে কারণে আমাদের সংস্কৃতিতে কোরবানির পশুর ক্ষেত্রে গরু কোরবানি প্রাধান্য পেয়েছে। কোরবানির পশুর গোশ্ত তিনভাগ করে একভাগ গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া এবং পশুর চামড়া দান করে দেওয়া আমাদের সংস্কৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কোরবানির ঈদের প্রায় এক মাস পরে আশুরা আসে। হজরত হুসায়ন রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আন্হু কারবালা প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ মুহররম পরিবারে জান কোরবান করে ইসলামের ইতিহাসকে ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল করেন। কোরবানির ঈদও ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল। যে কারণে অনেক সপরিবারে কোরবানির গোশ্ত আশুরা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয় ইমাম হুসায়ন রাদি আল্লাহু তা’য়ালা আন্হুর ইসালে সওয়াবের জন্য।

কোরবানির ঈদের দিন ভোরবেলায় বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে গভীর এক অনন্য আনন্দ-আমেজ বিচ্ছুরিত হতে থাকে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে শিশু-কিশোর ও যুবকদের মধ্যে। সকাল সকাল ভালোভাবে সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করে সাধ্যানুযায়ী পরিষ্কার ও পবিত্র ভালো পোশাক পরে, চোখে সুরমা লাগিয়ে, দেহে আতর মেখে, আতর ভেজানো তুলা কানের ভেতর গুঁজে, মাতায় টুপি দিয়ে সব পুরুষ, শিশু, বুড়ো, কিশোর, প্রৌঢ়, যুবকরা সঙ্গী-সাথী নিয়ে ছোটেন ঈদগাঁহে কিংবা মসজিদে। শহর এলাকাতে কোনো কোনো স্থানে মহিলারাও ঈদের জামায়াতে শরীক হন। ঈদগাঁহে বা মসজিদে যাবার সময় উচ্চারিত হতে থাকে তকবীর :আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার লাইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল্ হাম্দ-আল্লাহ্ মহান, আল্লাহ্ মহান, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ্ নেই, আল্লাহ্ মহান, আল্লাহ্ মহান, সব প্রশংসা তাঁরই জন্য।

ঈদের নামাজের জামায়াত এক আনন্দমুখর অনুভবে অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে ইমাম সাহেব খুত্বা দেন। অনেক স্থানের ঈদগাঁহে বিশিষ্ট কোনো আলিমকে দাওয়াত করে আনা হয়। ঈদের নামাজ শেষ হলে পারস্পরিক বুক মেলানো বা কোলাকোলির মধ্যদিয়ে এক অপরূপ ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের স্ফূরণ ঘটে। এ বুক মেলানো বা কোলাকোলির মাঝে অনুরণিত হয় ঐক্য ও সংহতির আহ্বান।

বাংলা কাব্যের বিশাল আঙ্গিনা জুড়ে কোরবানির ঈদ স্থান করে নিয়েছে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উচ্চারণ মেখে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায় :ওরে হত্যা নয় এ, সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন। এভাবে বিশ্বের সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ই এক অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতিত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। আজ সারা দুনিয়ায় ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ্র বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় কবির ভাষায় বলি :ডুবে ইসলাম আসে আঁধার/ইব্রাহিমের মতো আবার/ কোরবানি দাও প্রিয় বিভব/জবীহুল্লাহ্ ছেলেরা হোক।

lলেখক :পীর সাহেব, দ্বাবিয়াপুর শরীফ, সাবেক পরিচালক,

ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ