ইসলামের সামাজিক আদব

ই সলামি শরিয়ত সামাজিক আদব-শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য  রেখেছে: ১. এ সব আদব-শিষ্টাচার পালন করাকালীন বা পালন করতে গিয়ে মানুষ কখনও আল্লাহেক ভুলে যায়। তাই শরিয়ত এ সব আদব পালনের পূর্বে এবং তা পালনকালীন তার সঙ্গে কয়েকটি ‘মাসনূন দু‘আ’ যুক্ত করে দিয়েছে। যেগুলো আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২. কোনো কোনো কাজকর্ম ও পন্থা-পদ্ধতি শয়তানি স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। উদাহরণত, একটি জুতো পরে চলা, বামহাত দ্বারা আহার করা ইত্যাদি। যে কারণে শরিয়ত তা নিষেধ করে দিয়েছে। কোনো কোনো কাজ এমন রয়েছে যা ফেরেশতাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। উদাহরণত, ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়াকালীন দু’আ পাঠ করা। যে কারণে শরিয়ত তেমনটির প্রতি উত্সাহিত করেছে। ৩. কিছু বিষয় এমন আছে যা থেকে কখনও কষ্ট-বিপদ পৌঁছতে পারে; যেমন এমন কোথাও শয়ন করা যেখানে উপরে ছাদ বা আড় নেই কিংবা শয়নকালীন বাতি জ্বালিয়ে রাখা। এ থেকেও শরিয়ত নিষেধ করে দিয়েছে। ৪. কোনো আদব-নিয়ম এমন হয়ে থাকে, যেক্ষেত্রে অনারব লোকজনের বিলাসী সভ্যতার বিরোধিতা করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমন পুরুষের রেশমি কাপড় পরিধান করা। ছবিযুক্ত কাপড় ঝুলানো বা সোনা-রুপার পাত্রে পানাহার। তাই এরও প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

ইসলাম এ সব আদবের মধ্যে বিরাট আকর্ষণ রেখেছে। এর যে বিষয়গুলো মৌলিক ও আসল পর্যায়ের তা সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিস শরিফে জোর তাকিদ করা হয়েছে। এ সব তাকিদ থেকে তার গুরুত্ব প্রকাশ পায়। এর মধ্যে কোনো কোনো বিষয় এমন যা সমকালীন কল্যাণ, আন্তঃদেশীয় সামাজিকতা ও সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হতে পারে।

ইসলামের দৃষ্টিতে কয়েকটি সামাজিক আদব হলো— ১. লাফিয়ে লাফিয়ে ব্যাঙ্গাতভাবে চলাচল করা যাবে না। ২. কোনো পুরুষ যেন দু’জন নারীর মাঝখান দিয়ে না হাঁটে। (আবু দাউদ) ৩. সেই ঘরে ফেরেশতারা প্রবেশ করে না, যে-ঘরে কুকুর বা কোনো জীব-জন্তুর ছবি শোভা পায়। (বুখারী) ৪. যখন কারও দরজার কড়া নাড়া দাও এবং ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কে? তখন জবাবে এমনটি বলবে না যে, ‘আমি’; (বরং নিজের নাম বলবে)। (বুখারী) ৫. গোপনে বা চুপে-চুপে কারও কথা বা বাক্যালাপ শুনতে যাবে না। (বুখারী) ৬. যখন কাউকে পত্র লিখো তখন শুরুতে নিজ নাম লিখে দেবে। (বুখারী) ৭. যখন কারও বাসা-বাড়িতে যাবে তখন প্রথমে (সালাম দিয়ে) অনুমতি নেবে তারপর প্রবেশ করবে। (বুখারী)  ৮. তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করার পরও অনুমতি পাওয়া না গেলে, ফেরত চলে আসবে। (বুখারী)  ৯. অনুমতি নেবার সময় দরজার সম্মুখ বরাবর না দাঁড়িয়ে ডানে বা বামে একপাশে দাঁড়াবে। (আবু দাউদ)  ১০. নিজের মা’য়ের কাছে যেতে হলে, তাতেও অনুমতি নিয়ে যাবে। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)  ১১. তামাশাচ্ছলেও কারও কোনো বস্তু নিয়ে হাঁটা শুরু করবে না। (তিরমিযী) ১২. উন্মুক্ত তরবারী (চাকু/ ছুরি ইত্যাদি) অন্য ব্যক্তির হাতে দিতে যাবে না। (তিরমিযী) ১৩. যুগ-সময়কে মন্দ বলতে যাবে না; কেননা তার পরিবর্তন-বিবর্তন আল্লাহ্রই হাতে। (মুসলিম) ১৪. বাতাসকে গাল-মন্দ করবে না। (তিরমিযী) ১৫. জ্বর-তাপকেও মন্দ বলবে না। (মুসলিম) ১৬. যখন রাত হয়ে যায় তখন ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে দরজা বন্ধ করে দেবে। কেননা শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না (এবং এভাবে বন্ধকৃত দরজা দিয়ে সে প্রবেশ করতে পারে না)। তারপর পানির মশক (কলস/ জগ-মগ ইত্যাদি) বিসমিল্লাহ্ বলে মুখ বন্ধ করে দাও বা বেঁধে দাও; অপরাপর সব পাত্র ঢেকে দাও। ১৭. রাতের বেলায় যখন অলি-গলি পথে, রাস্তায় লোকজনের চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তেমন সময়ে যথাসাধ্য বাইরে কম বের হবে। (শরহুস্সুন্নাহ্) ১৮. সাধারণ লোকজনের পরিবেশে বা সামনে তথা কারও মুখোমুখি হয়ে হাইতোলা বা ঢেঁকুর দিতে থাকা ভদ্রতার খেলাফ। ১৯. পেটের মধ্যে যদি বায়ুর চাপ বেশি হয় তা সম্ভব হলে বাথরুমে বা নির্জনে ত্যাগ করতে সচেষ্ট হবে।

লেখক: মুফতী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

বায়তুল মোকাররম, ঢাকা।