লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ‘লজ্জাজনক’ বলে নাকচ করলো হিজবুল্লাহ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সরাসরি শান্তি আলোচনার পর ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে প্রস্তাবিত নতুন যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাটি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের আগেই গভীর অনিশ্চয়তা ও চরম সংকটের মুখে পড়েছে। 

লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধান নাইম কাসেম এই আলোচনার ফলাফলকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েলের সঙ্গে লেবানন সরকারের এই সরাসরি আলোচনাকে দেশের জন্য ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবটিতে কোনো কার্যকর বাস্তবায়ন বা তদারকি প্রক্রিয়া না থাকায় এটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। 

শুক্রবার (৫ জুন) সকালে মিডল ইস্ট আই-এর মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।

কংগ্রেসের ওয়াশিংটন দপ্তরে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আতিথেয়তায় লেবানন ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের মধ্যে দুই দিনব্যাপী চলা চতুর্থ দফার সরাসরি আলোচনার পর এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি সামনে আসে। মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া এই আলোচনায় লেবাননের পক্ষে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ এবং লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসা। 

বৈঠকে দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করাসহ কিছু নির্দিষ্ট ‘পাইলট জোন’ বা পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব করা হয়, যেখানে কোনো অরাষ্ট্রীয় শক্তির উপস্থিতি ছাড়াই কেবল লেবাননের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী বা এলএএফ একক সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। তবে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের ঘনিষ্ঠ একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই বা এমইই-কে নিশ্চিত করেছেন যে এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে হিজবুল্লাহর সবুজ সংকেত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।

ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও জানান, ওয়াশিংটনে যখন এই গোপন ও কঠোর আলোচনা চলছিল, তখন হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্ব বা তাদের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও লেবানন সংসদের স্পিকার নাবিহ বেরি এই আলোচনার ভেতরের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন না। খসড়া প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হওয়ার পর লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন তা হিজবুল্লাহ ও নাবিহ বেরির কাছে তাদের আনুষ্ঠানিক মতামতের জন্য পাঠান। 

আলোচনার নেপথ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈঠকটি অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং ইসরায়েলি প্রতিনিধি দল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আপত্তি জানালে লেবাননের প্রতিনিধিরা আলোচনা বয়কট করার হুমকি দেন। পরবর্তীতে মধ্যস্থতাকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র একটি মধ্যপন্থা হিসেবে এই পাইলট জোনের ধারণাটি প্রস্তাব করে, যা দক্ষিণ লেবাননের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি প্রাথমিক পরীক্ষা হিসেবে কাজ করার কথা ছিল।

লেবাননের সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দল এই চুক্তির খসড়ায় বারবার ‘আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার’ নিন্দা জানানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর দেয়। লেবাননের প্রতিনিধিরা এটিকে তেহরানের সঙ্গে চলমান মার্কিন পরমাণু ও যুদ্ধবিরতি আলোচনা থেকে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত সংঘাতের ট্র্যাকটিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার একটি সূক্ষ্ম মার্কিন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। 

উল্লেখ্য, গত ১৭ এপ্রিল ঘোষিত নামমাত্র যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী বিমান হামলা এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়েছে, যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে বিস্তৃত। এই নতুন মার্কিন প্রস্তাবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বা তাদের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ বা বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।

এদিকে হিজবুল্লাহর ভেতরের কৌশলগত চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ শুরু থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে লেবানন সরকারের এই সরাসরি আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। কারণ তারা জানত যে এই পথটি শেষ পর্যন্ত লেবাননের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করবে। হিজবুল্লাহর বর্তমান প্রধান নাইম কাসেম পরবর্তীতে এক কড়া বার্তায় বলেন, একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হতে হলে অবশ্যই দক্ষিণ লেবাননের অধিকৃত অঞ্চলসহ পুরো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ইসরায়েলি বাহিনীকে সম্পূর্ণ পিছু হটতে হবে। 

তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যতদিন আমাদের গ্রামগুলো অনিরাপদ থাকবে, আমাদের ওপর বোমা বর্ষণ ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হবে এবং আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ নিহত হবে, ততদিন উত্তর ইসরায়েলের কোনো শহর বা জনপদও কখনো নিরাপদ থাকবে না’। তিনি যুদ্ধবিরতির নামে হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগের যেকোনো শর্তকে সম্পূর্ণ অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেন।

লেবাননের রাজনীতি ও কূটনৈতিক মহলেও এই মার্কিন প্রস্তাবের ভাষা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। আলোচনার বাইরে থাকা লেবাননের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এই চুক্তিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি বক্তব্যকে সমর্থন করে হিজবুল্লাহকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নয়, বরং ‘লেবাননেরও শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা লেবানন রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিব্রতকর। 

এই তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ মূলত বৈরুতের সামনে একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কঠিন পথ তৈরি করেছে, যেখানে লেবানন প্রেসিডেন্সি এই প্রস্তাবটিকে যুদ্ধ বন্ধের শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছে, আর হিজবুল্লাহ একে দেখছে কূটনীতির মাধ্যমে ইসরায়েলের সামরিক ব্যর্থতা ঢাকার একটি অপচেষ্টা হিসেবে। এই মাসের শেষের দিকে দুই দেশের প্রতিনিধিদের আবারও বসার কথা থাকলেও হিজবুল্লাহর সরাসরি সমর্থন ছাড়া এই প্রস্তাবটি কেবল কাগজের দলিল হিসেবেই থেকে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই