দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে একটি ঐতিহাসিক খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। চিঠিতে তিনি রুশ প্রেসিডেন্টকে সরাসরি একটি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক মহল এই যুদ্ধ নিয়ে চূড়ান্তভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে যুদ্ধ বন্ধের এটাই উপযুক্ত সময় বলে দাবি করেছেন।
শুক্রবার (৫ জুন) যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই খোলা চিঠির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পাঠানো এই চিঠিতে ভলোদিমির জেলেনস্কি বিগত ২৬ বছর ধরে পুতিনের শাসনকালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি যখন ২৬ বছর আগে রাশিয়ার ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন ইউক্রেনের বহু মানুষ আপনাকে ইতিবাচকভাবে দেখত, কিন্তু সেই দিন এখন সম্পূর্ণ অতীত।
আজ ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোনগুলো যখন ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গে আপনার আন্তর্জাতিক ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আঘাত হানে, তখন ইউক্রেনের সিংহভাগ মানুষ তা আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করে। জেলেনস্কি পুতিনকে উদ্দেশ্য করে লেখেন, আপনি রাশিয়ার ক্ষমতায় থাকার প্রায় অর্ধেক সময় জুড়েই ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন এবং ন্যাটো বা ভূ-রাজনীতির অজুহাত দিলেও এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত জেদের ফসল, যার কোনো বাস্তব কারণ ছিল না এবং ইতিহাস একে এভাবেই মনে রাখবে।
চিঠিতে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার বিশাল সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, গত মে মাসে ইউক্রেন ফ্রন্টে আপনার সেনাবাহিনীর ৩০ হাজারেরও বেশি সৈন্য নিহত এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট ভিডিও প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রুশ যুদ্ধক্ষেত্রে মোট ক্ষয়ক্ষতির ৬৩ শতাংশই সরাসরি নিহতের ঘটনা, যা একবিংশ শতাব্দীর কোনো আধুনিক সেনাবাহিনীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
জেলেনস্কি দাবি করেন, রাশিয়ার সাধারণ মানুষ এখন আপনার এই যুদ্ধ এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আর স্বস্তিতে নেই, তারা প্রতিনিয়ত আমাদের ড্রোন ও মিসাইল হামলা, গ্যাসের তীব্র সংকট, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং দ্বিতীয় দফায় সেনা সমাবেশের নতুন পরিকল্পনাকে চরমভাবে অপছন্দ করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, রাশিয়ার সম্পদ ও রাজনৈতিক পুঁজি দিন দিন দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, যা দিয়ে আপনি আর বেশিদিন রুশদের আনুগত্য কিনতে পারবেন না।
ভলোদিমির জেলেনস্কি তার চিঠিতে আরও উল্লেখ করেন, ইউক্রেন এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় না এবং জীবন যে যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, তা আমরা খুব ভালো করেই জানি। তিনি পুতিনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইউক্রেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রেখেছে, যেখানে আপনি ভেবেছিলেন ইউক্রেন দ্রুত ভেঙে পড়বে, আজ আমরা এই যুদ্ধের পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছি। ইউক্রেন বিশ্বজুড়ে বহু দেশকে নিজেদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করেছে, যার ফলে আমরা নিয়মিত অস্ত্র ও অর্থ পাচ্ছি আর আপনি পাচ্ছেন কেবল আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বানের উদাহরণ টেনে জেলেনস্কি বলেন, যাঁরা এই অন্যায্য যুদ্ধে রাশিয়াকে সাহায্য করতে চেয়েছেন, তারা শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে চরমভাবে অপমানিত হয়েছেন। তিনি আরও কটাক্ষ করে বলেন, রাশিয়ার ইতিহাসে আপনিই প্রথম শাসক, যাকে যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ংয়ের কাছে হাত পাততে হয়েছে এবং আজ আপনি পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
কূটনৈতিক প্রস্তাবের অংশ হিসেবে জেলেনস্কি বলেন, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের দিকে মনোনিবেশ করেছে, তাই ইউরোপের যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ফিরে আসা পর্যন্ত কেবল অপেক্ষা না করে আমাদের নিজেদের মধ্যেই সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত।
মস্কো বা কিয়েভ কোনো নেতার সফরের জন্য উপযুক্ত নয় উল্লেখ করে তিনি সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক বা আরব বিশ্বের মতো কোনো নিরপেক্ষ দেশে একটি নির্দিষ্ট তারিখে মুখোমুখি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। এই আলোচনার টেবিলে ইউক্রেন ও রাশিয়ার জন্য প্রকৃত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট তার চিঠির শেষ অংশে স্পষ্ট করে বলেন, শান্তি আলোচনার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ইউক্রেন আলোচনার পুরো সময় জুড়ে মাঠপর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে, যা উপগ্রহের মাধ্যমে আমেরিকা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এ ছাড়া তিনি যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবনা হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ‘অল-ফর-অল’ বা সব বন্দির বিনিময়ের পাশাপাশি যুদ্ধ চলাকালীন নিয়ে যাওয়া বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
পুতিনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জেলেনস্কি বলেন, আপনি যদি নিজে থেকে এই যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত না নেন, তবে ইউক্রেন নিজের অস্তিত্বের জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে এবং রাশিয়ার ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী রুশ জনগণ যখন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন আপনার নিজের অস্তিত্বই চরম সংকটের মুখে পড়বে। তিনি চিঠির শেষে এই যুদ্ধে প্রাণ হারানো সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং ‘গ্লোরি টু ইউক্রেন’ স্লোগান দিয়ে তার বক্তব্য শেষ করেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান