সংবিধান সংস্কার যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন কেবল সংশোধন হবে: চিফ হুইপ

দেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ‘সংস্কার’ পর্ব ইতিমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন তা আইনি রূপ দিতে সংবিধানে কেবল ‘সংশোধন’ আনা হবে বলে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের সংবিধানের আমূল পরিবর্তন বা সংস্কার নাকি বিদ্যমান কাঠামোর সংশোধন করা হবে—এমন এক জটিল ও সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘সংবিধানের মৌলিক সংস্কারটা মূলত হয়ে গেছে, যা হওয়ার তা চূড়ান্ত হয়েছে। এখন হবে সুনির্দিষ্ট সংশোধন। সংবিধান সংশোধনই হবে এবং দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার সদস্য হিসেবে আমরা সেটাই করতে যাচ্ছি।’

শনিবার (৬ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশের সাংবিধানিক ও আইনি রূপরেখা নিয়ে কথা বলার সময় তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন।

সংবিধান সংশোধনীর লক্ষ্যে সংসদে একটি সর্বদলীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘আমরা এই ঐতিহাসিক কাজটি একতরফাভাবে করতে চাই না। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, এমনকি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নিয়েও আমরা একযোগে এই কাজটা করব। সে জন্যই আমরা সংসদে একটি বিশেষ কমিটির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেছি। সরকারি দলের পক্ষ থেকে কিছু যোগ্য ও বিশেষজ্ঞ নাম আমাদের তালিকায় ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত আছে।

এখন সংসদে থাকা বিরোধী দল যখন তাদের মনোনীত সদস্যদের নাম জমা দেবে, তখন আমরা সবাই একত্র হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করব। আমাদের দল ও জোটের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, আমরা ইচ্ছে করলেই নিজেদের মতো করে তা পাস করতে পারি, কিন্তু আমরা তা করব না। আমরা সকলকে সাথে নিয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে চলতে চাই।’ সাংবাদিকরা যদি বিরোধী দল নাম না দেয় তবে কী হবে—এমন প্রশ্ন তুললে তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘বিরোধী দল নাম দেবেই। কেন দেবে? কারণ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া কারও সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই।’

ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মূল ভিত্তি ‘জুলাই সনদ’-এর সংবিধান সম্পর্কিত বিষয়গুলো দেশের মূল সংবিধানে যুক্ত করার বিষয়ে সংসদে সকলে একমত উল্লেখ করে চিফ হুইপ বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্যের এই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে হলে সংবিধান সংশোধন করা লাগবেই। এর কোনো বিকল্প আর কিছুই নেই। আমাদের দলের প্রধান ও সর্বাধিনায়ক তারেক রহমান স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, জুলাই জাতীয় সনদ কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়া দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন সহকারে হুবহু বাস্তবায়ন করা হবে এবং আমরা সংসদে তা বাস্তবায়ন করবই। এই বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্য হচ্ছে—তারাও এটার বাস্তবায়ন চায়, আমরাও চাই; তবে তারা কেবল আদেশটা বাস্তবায়ন করতে চায়, আর আমরা পুরো জুলাই জাতীয় সনদটা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে চাই।’

সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক অধিকারের ধারাগুলো কোনোভাবেই পরিবর্তনযোগ্য নয়। এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ধারা যদি অসাবধানতাবশত সংশোধন করাও হয়, তবে সেই সংশোধিত অংশটুকু আপনাআপনি বাতিল হয়ে যাবে, দেশের আইনি কাঠামোতে এ রকম কঠোর আইন আছে। তারপরও সার্বভৌম সংসদ যদি কোনো কিছু ভুলবশত করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছেন সংবিধানের মূল “কাস্টডি” বা অভিভাবক। অতীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে দেশের সব বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা বাতিল করে দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট।’ তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, সাম্প্রতিক গণভোটে দেশের ৭২ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক পক্ষে ভোট দিয়েছে এবং দেশের বৃহত্তম দল হিসেবে আমাদের প্রার্থীরা ৫২ শতাংশ মানুষের সরাসরি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে, যা মূলত এই সংস্কার ও সনদের পক্ষেই গণরায়।