ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় রায়ের জন্য আজ ধার্য রয়েছে।
রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করবেন।
গত ১৯ মে সকালে প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ার ঘরে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যার শিকার হয় ছোট্ট এই শিশুটি। পরদিন ২০ মে (১৯ মে দিবাগত রাত) ১২ টা ৫ মিনিটে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ভিকটিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো ও লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
এরপর মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে দেশজুড়ে আলোচিত এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ রায় ঘোষণার অপেক্ষা।
গত বুধবার (৩ জুন) এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি হয়। শুনানিতে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। ওইদিন সকাল ১১ টা ১০ মিনিটে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনে এ শুনানি শুরু হয়। এর আগে আসামি সোহেল ও তার স্ত্রীকে আদালতে তোলা হয়।
এসময় বিচারক সাক্ষীদের জবানবন্দি পড়ে শোনান। এরপর আসামি সোহেলের কিছু বলার আছে কিনা জানতে চাইলে সোহেল আদালতকে বলেন, আমি নির্দোষ খালাস চাই। আমার একটা ছাওয়াল আছে আমাকে মাফ করে দেন স্যার। আমার সাথে ছিল ডলার। ওকে কেউ দেখে নাই স্যার। ওরে ধরেন স্যার। সেওতো দোষী। আমার পাপের শাস্তি আমারে দেন। আরেকটা কথা স্যার, আমার বউ কিছু করে নাই, সে নির্দোষ। এসময় বিচারক তাকে থামিয়ে বলেন আপনারটা আপনি বলেন। এরপর সোহেল নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
এরপর স্বপ্নার বক্তব্য শুনতে চান আদালত। স্বপ্না আদালতকে জানান, আমি কিছু করিনি। এসময় আদালত তাকে উদেশ্য করে বলেন, দরজা কেন খুলেননি এর কোন ব্যাখ্যা দিতে চান কিনা। এসময় তাকে সতর্ক করে আদালত বলেন, আপনার স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে শাস্তি তার হবে একই শাস্তি আপনারও হবে।এরপর স্বপ্না আবারও বলেন, স্যার আমি নির্দোষ, আমি কিছু করিনি।
যুক্তিতর্ক শুনানিতে 'ডলার' প্রসঙ্গ: 'বিচারে বিভ্রান্তির অপচেষ্টা'
মামলার এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদনে কোথাও না থাকা নাম 'ডলার'কে সামনে আনে আসামি সোহেল। গত ১ জুন এ মামলায় অভিযোগ গঠনের দিন ঘটনার সাথে ডলার নামে একজন জড়িত বলে দাবি করে সোহেল। ওইদিন অভিযোগ গঠন শুনানি শেষে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কেটেছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করেছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।
এসময় সোহেল আরও বলেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেন। এরপর পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন। আসামি সোহেলকে কাঠগড়া থেকে নামিয়ে প্রিজন ভ্যানে নেওয়ার সময়েও এসব কথা বলেন তিনি।
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ‘ডলার’ প্রসঙ্গকে বিচার বিভ্রান্তির অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে। গত ৪ জুন যুক্তি উপস্থাপন শুনানিতে বিশেষ প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি কিংবা তদন্তের কোনো পর্যায়েই ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির উল্লেখ ছিল না। এ আসামি জবানবন্দিতে বলেনি ডলারের নাম।
এটা মূলত সে যখন অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে কারাগারে থেকেছেন, সেখান থেকে অন্যান্য আসামিদের কাছ থেকে এই বুদ্ধি-পরামর্শ পান। তবে একই সঙ্গে যেটা বলতে হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসামি সোহেল কিন্তু স্বেচ্ছায় নিজের দোষ স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন। বলা যায়, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে। তার মতে, বিচার প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে এমন নাম উল্লেখ করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিচার বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছেন আসামি সোহেল।
এ মামলায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার সম্পৃক্তা সম্পর্কে পিপি দুলু আদালতে বলেন, সে (স্বপ্না) কিন্তু রামিসার এই অবস্থা দেখে বাইরে এসে চিৎকার করে জানাতে পারত। কিন্তু তিনি তা করেননি। শুধু সোহেলকে জানালা দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন এমনটি না, পুরো ব্যাপারে স্বপ্না সেখানে অবস্থান করে সহায়তা করেছেন। তিনি যদি নিরপরাধ হতেন, তাহলে কাউকে না কাউকে জানাতেন।