দলের ভাঙন আটকাতে তীব্র চেষ্টায় মমতা, ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কৌশল

তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) ভেতরে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জি নতুন রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছেন। দলীয় বিদ্রোহ ও ভাঙনের আবহে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে দলের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে তিনি বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার আসন্ন বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যাচ্ছেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর অনুসারে, সোমবার (৮ জুন) দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। মমতা ব্যানার্জি রোববার (৭ জুন) দিল্লি পৌঁছাবেন এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে থাকবেন বলে টিএমসি সূত্রে জানা গেছে। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি ইতিমধ্যে শনিবার রাজধানীতে পৌঁছে গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মমতা, অভিষেকসহ দলের কয়েকজন প্রবীণ সাংসদ একসঙ্গে এই বৈঠকে অংশ নেবেন।

দলের ভেতরে চলা অসন্তোষের মধ্যেই গত শুক্রবার মমতা বড় ধরনের সাংগঠনিক রদবদল করেছেন। এতে তার ঘনিষ্ঠ ও পুরনো নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। বিতর্ক সত্ত্বেও অভিষেক ব্যানার্জিকে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে রেখেছেন, যদিও সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে টিএমসির খারাপ ফলের পর তার ভূমিকা নিয়ে দলের অন্দরে তীব্র সমালোচনা চলছে।

একই সঙ্গে ডেরেক ও'ব্রায়েন ও ডোলা সেনকে যৌথ জাতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, এর মাধ্যমে মমতা বার্তা দিতে চেয়েছেন যে ভবিষ্যতে সংগঠনের সিদ্ধান্ত আর এককভাবে নয়, যৌথভাবে নেওয়া হবে। একজন জ্যেষ্ঠ টিএমসি নেতা জানিয়েছেন, দলের মূল অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিষেক ব্যানার্জি। মমতা এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দলের ভেতরের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।

ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকের আগে কংগ্রেসও টিএমসির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। টিএমসি সূত্র জানিয়েছে, মমতা দিল্লিতে থাকাকালীন সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন, তবে এখনও তা নিশ্চিত হয়নি। কংগ্রেসের এক প্রবীণ নেতা বলেছেন, অতীতে মমতার কংগ্রেস-বিরোধী অবস্থান ও জোটের নেতৃত্ব নিয়ে তার সমালোচনার কথা মাথায় রেখে এবার খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা দেখানো হবে না, তবে একেবারে দূরেও থাকা হবে না।

এদিকে টিএমসিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মূল নেতৃত্বের দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিধানসভায় প্রায় ৬০ জন বিদ্রোহী বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিরোধী দলনেতা হিসেবে উঠে আসা ঋতব্রত ব্যানার্জি প্রস্তাব দিয়েছেন, মমতা দলে প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে থাকতে পারেন। তবে এই প্রস্তাব নিয়েই বিদ্রোহী শিবিরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

বিদ্রোহী বিধায়ক গুলশান মল্লিক বলেন, মমতা যদি সর্বোচ্চ নেতা না থাকেন, তাহলে পুরো বিষয়টাই আবার ভাবতে হবে। অন্যদিকে বিদ্রোহী বিধায়ক সঙ্গীতা রায় বসুনিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মমতা ব্যানার্জিই আমাদের সর্বোচ্চ নেতা এবং থাকবেনও।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, মমতা এখন মুসলিম বিধায়কদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। বিধানসভায় ৮০ জনের মধ্যে ৩১ জন মুসলিম বিধায়ক থাকায় এই অংশটি রাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কয়েকজন মুসলিম বিধায়ক ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিলেও অনেকে এখনও মমতার পাশেই রয়েছেন।

লোকসভায় টিএমসির ২৮ জন সাংসদের মধ্যেও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কথা উঠছে, দিল্লিতে মমতা থাকাকালীনই কয়েকজন সাংসদ লোকসভা স্পিকারের কাছে অভিষেক ব্যানার্জিকে সংসদীয় দলের নেতা পদ থেকে সরানোর দাবি জানাতে পারেন। এক জ্যেষ্ঠ সাংসদ বলেছেন, বিধানসভার মতো লোকসভাতেও বড় ধরনের ভাঙন হতে পারে। ১৯ জনের সমর্থন পেলেই অভিষেককে সরানো সম্ভব এবং সেই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, নেতৃত্বের সংকট এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের জায়গা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা, এসব কিছু মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস