কফিনবন্দী হয়ে লেবানন থেকে ফিরলো পরিবারের একমাত্র ছেলেটি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে কফিনবন্দী হয়ে নিজ বাড়িতে ফিরলো লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার আশাশুনির কৃতি সন্তান নাহিদুল ইসলাম নাহিদের (২০) মরদেহ।

রোববার (৭ জুন) সকালে তার মরদেহ উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে মা-বাবার বুকফাটা কান্না আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে পরিবেশ। 

এর আগে, শনিবার ভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় লেবাননে নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসীর মরদেহ। সেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

রোববার দুপুরে আশাশুনির কাদাকাটি দাখিল মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে নিহত নাহিদুল ইসলামের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। আল হাদিস জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল মালেক গাজী জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে অশ্রুসিক্ত নয়নে নাহিদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।

একই সঙ্গে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামেও অপর প্রবাসী শফিকুল ইসলামের দাফন সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ বাসভবনে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (২০) এবং একই সঙ্গে নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৮)। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় পর সরকারি উদ্যোগে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হলো।

নাহিদের চাচা স্বাধীন বলেন, ‘নাহিদ আমার আপন ভাইপো। মৃত্যুর দিন সকাল ১১টার দিকে সে আমার ভাইয়ের মোবাইলে ভিডিও কল দিয়ে ওখানকার যুদ্ধপরিস্থিতি দেখাচ্ছিল। সে বলছিল, ‘কাকা, এই যে আমার ঠিক পাশেই একের পর এক বোমা পড়ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে; আমি প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে আছি।’ এর ঠিক চার-পাঁচ ঘণ্টা পরেই আমরা খবর পাই যে নাহিদ আর বেঁচে নেই। তার এই আকস্মিক মৃত্যু আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। তবে শত কষ্টের মাঝেও আমরা সান্ত্বনা পাচ্ছি যে, তার মরদেহটি শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে এনে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করতে পারছি।’


নাহিদের চাচাতো ভাই শাহিন বলেন, ‘ও খুব হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে, ওর বাবাও একজন প্রতিবন্ধী। মূলত সংসার চালানোর হাল ধরতেই সে লেবাননে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ইসরায়েলের হামলায় সে অকালে মৃত্যুবরণ করলো। তার লাশ দেশে আসবে কি না, তা নিয়ে আমরা চরম সংশয়ের মধ্যে ছিলাম। তবে সরকার ও দেশবাসীর চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত লাশটি আমরা ফেরত পেয়েছি। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, তারা যেন এই অসহায় ও নিঃস্ব পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়।’

কাদাকাটি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক তুহিন উল্লা তুহিন বলেন, ‘আজকের এই দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এই ছেলেটাকে বিদেশ পাঠাতে তার পরিবার বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজন ও এনজিওর কাছ থেকে প্রায় ১৫-১৬ লাখ টাকা ঋণ করেছিল। বিশ্ব রাজনীতির এক নির্মম শিকার হয়ে লেবাননে তার মৃত্যু হলো। এই অসহায় পরিবারটি যাতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য খাত থেকে প্রাপ্য আর্থিক সহযোগিতা দ্রুত পায়, সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই অনুদান পেলে পরিবারটি হয়তো ঋণের বোঝা কাটিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।’

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ কুন্ডু জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে দুই দফায় ৫০ হাজার ও ৩৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া পবিত্র ঈদুল আজহার আগে ৫ হাজার টাকার একটি বিশেষ প্যাকেজ সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

খুলনা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান জানান, লাশ দেশে আসার পরপরই জরুরি খরচ ও দাফন বাবদ নিহতদের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার কারণে পরিবারগুলো পরবর্তীতে আরও ১৩ লাখ টাকা আর্থিক সুবিধা পাবেন। যার মধ্যে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এবং বাকি ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে জীবন বীমা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে।

তিনি আরও বলেন, ‘২০২৩ সালের ১লা জানুয়ারির পর যারা বৈধভাবে দেশের বাইরে গিয়েছেন, তাদের পরিবার এই ১৩ লাখ টাকার পুরো সুবিধাটি পাচ্ছেন। তবে এই তারিখের আগে যারা বিদেশ গিয়েছিলেন, তারা জীবন বীমার ১০ লক্ষ টাকা পাবেন না, শুধুমাত্র সরকারের ৩ লক্ষ টাকার অনুদানটি পাবেন। কারণ পূর্ববর্তী সময়ে জীবন বীমা কর্পোরেশনের এই বিশেষ সুবিধাটি চালু ছিল না।’

কর্মকর্তারা আরও জানান, ক্লিয়ারেন্স ও ফ্লাইট সাপেক্ষে লেবাননে নিহত কলারোয়ার অপর প্রবাসী শুভ কুমার দাসের মরদেহও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।