দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম রূপ নিয়েছে। মার্কিন আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দিতে বুধবার (১০ জুন) সকাল থেকে জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত আমেরিকার বিভিন্ন কৌশলগত সামরিক ও নৌঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে তেহরান।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ‘আইআরজিসি’ এবং খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দফতর এই যৌথ অভিযানের দায় স্বীকার করে জানিয়েছে যে ওয়াশিংটন তাদের আক্রমণ বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে আরও বিধ্বংসী ও চূড়ান্ত পাল্টা আঘাত হানা হবে।
আইআরজিসি মহাকাশ শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে জর্ডানের একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটিতে তাদের ছোড়া দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। মার্কিন সেনাদের অবস্থান করা ওই ঘাঁটির প্রধান চারটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা, যার মধ্যে আমেরিকার অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার এবং একটি প্রধান কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রয়েছে।
আইআরজিসি স্পষ্ট করেছে যে এই আক্রমণটি ছিল আমেরিকার পূর্ববর্তী বিমান হামলার বিরুদ্ধে নেওয়া তাদের এক বৃহৎ পাল্টা অভিযানের শেষ ধাপ, যার আওতায় পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মোট ২১টি পয়েন্টে আঘাত করা হয়েছে এবং ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশকারী একটি মার্কিন ‘এমকিউ-৯’ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে।
এই পাল্টা অভিযানের অংশ হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী পঞ্চম নৌবহরের প্রধান সামরিক ঘাঁটিতেও একযোগে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। আইআরজিসি এবং খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তর নিশ্চিত করেছে যে নিজেদের একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে উছিলা বানিয়ে দক্ষিণ ইরানের জাস্ক, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে আমেরিকার চালানো বিমান হামলার প্রতিবাদেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর বোমাবর্ষণে সিরিকের বেমানি এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার পর পরই ইরান এই পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, যার ফলে বাহরাইনজুড়ে আকস্মিক সতর্কতা সাইরেন বাজানো হয় এবং দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাধারণ জনগণকে নিকটতম নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
একই সময়ে কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘আলি আল সালেম’ ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেও পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই বিমান হামলার মুখে কুয়েতের সেনাবাহিনী এক জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তাদের জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে আকাশপথে ধেয়ে আসা শত্রুপক্ষের বৈরী লক্ষ্যবস্তুগুলো প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।
কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দেশের নাগরিকদের সার্বিক সুরক্ষাসংক্রান্ত সকল নির্দেশনাবলী কঠোরভাবে মেনে চলার পাশাপাশি যেকোনো বিভ্রান্তি এড়াতে শুধুমাত্র অনুমোদিত সরকারি সূত্র থেকে তথ্য নেওয়ার বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাত ও উত্তেজনা মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা ‘সেন্টকম’ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। মার্কিন সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে তারা দক্ষিণ ইরানে তাদের ভাষায় একটি ‘আত্মরক্ষামূলক’ বিমান হামলা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। তবে তেহরান থেকে আল জাজিরার বিশেষ সংবাদদাতা মোহাম্মদ ভাল জানিয়েছেন যে ইরানের সামরিক কমান্ডের বার্তাগুলো অত্যন্ত কড়া ভাষার ছিল এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার এককভাবে ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে বলে তারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা ও মিডল ইস্ট আই