দীর্ঘ ২৭ বছর পর যুবককে সন্তানের স্বীকৃতি দিলেন বাবা

দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বাধা পেরিয়ে ২৭ বছর আগে জন্ম নেওয়া আরিয়ান নামে এক যুবককে সন্তানের স্বীকৃতি দিলেন বাবা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা গ্রামের এ ঘটনায় স্বস্তি ফিরেছে সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারে।

জানা যায়, শিশুটির যখন জন্ম হয়, তখন বাবা বিদেশে ছিলেন। জন্মের আগেই মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। বাবাকে না দেখেই মামার বাড়িতে বড় হতে থাকে শিশুটি। বড় হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার বাবা বিদেশ থেকে ফিরে আরেকটি বিয়ে করেছেন। দেশেই আছেন তিনি। বাবার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ছেলে। চান স্বীকৃতি। কিন্তু বাবা তাকে ছেলে হিসেবে মানতে নারাজ। একপর্যায়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ে বাবার স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেন ছেলে। পরে মঙ্গলবার (৯ জুন) বাবার কাছ থেকে সেই স্বীকৃতি পেলেন ছেলে।

গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সহকারী সিভিল জজ) সুব্রত দাশের সভাপতিত্বে একটি মধ্যস্থতা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় আইন সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২১গ ধারার বিধান অনুযায়ী পিতা মুরশেদ ও তার ছেলে আরিয়ানের (ছদ্মনাম) মধ্যে একটি মধ্যস্থতা চুক্তি সম্পাদিত হয়। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের অফিস সহকারী মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা যায়, আদালতের নির্দেশে মা, বাবা ও ছেলের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানেই নিশ্চিত হওয়া গেছে, ছেলের দাবি সঠিক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডিএনএ প্রতিবেদনটি লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে পাঠায়। মঙ্গলবার সেখানে বাবা ছেলেকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, ঘর করার জন্য দুই লাখ টাকা, পাড়া-প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সন্তানকে পরিচয় করে দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকারনামাও করেন বাবা।

লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী জজ) সুব্রত দাশ বলেন, বাবা তার সন্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দুজন দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। লিগ্যাল এইড চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের দুজনকে টি-শার্ট উপহার দেওয়া হয় দীর্ঘদিনের বিরোধে মীমাংসায় দুজন এগিয়ে আসায়।

চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা যায়, বাবার স্বীকৃতি পাওয়া যুবক আরিয়ানের জন্ম রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা গ্রামে। তার জন্মের সময় বাবা মুরশেদ প্রবাসে ছিলেন। জন্মের কিছুদিন পরই আরিয়ানের মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে।

পরে আরিয়ানের মা অন্যত্র বিয়ে করলে তিনি মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাবা মুরশেদের কাছ থেকে সন্তানের স্বীকৃতি পাননি। অবশেষে পিতৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় ২০২৪ সালে মাকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ করেন আরিয়ান।

সেখানে হাজির হন বাবা। কিন্তু ছেলেকে তার নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। পরে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে প্রমাণ মেলে ছেলের দাবিই সঠিক। ডিএনএ প্রতিবেদন পেয়ে বাবা অবশেষে ছেলেকে মেনে নেন। টেনে নেন তার বুকে।

জন্মের ২৭ বছর পর স্বীকৃতি পেয়ে খুশি আরিয়ান। তিনি বলেন, এত বছর বাবার পরিচয় দিতে পারতাম না। লোকজন নানা কথা বলত। এখন বাবা সন্তান হিসেবে মেনে নেওয়ায় সমাজে আর কারও কটু কথা শুনতে হবে না। এটি অনেক বড় আনন্দের।