স্বৈরাচারের ছায়ায় বিশ্বকাপ

আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপা জয়ে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চ আর গৌরবের, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কিছু অন্ধকার অধ্যায়ও। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা আয়োজিত এক ইতিহাসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্তত দুবার স্বাগতিক দেশের একনায়ক ও একচ্ছত্র শাসকরা ম্যাচ ফিক্সিং বা ম্যাচ পাতানোর মাধ্যমে বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের দেশে রেখেছিলেন।

ফিফার সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত "দ্য রেলেভেন্স অ্যান্ড ইমপ্যাক্ট অফ ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপস" শীর্ষক চার দিনব্যাপী এক সিম্পোজিয়ামে শিক্ষাবিদ এবং ইতিহাসবিদরা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তাদের মতে, ১৯৩৪ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক বেনিতো মুসোলিনি এবং ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণাকে সফল করতে পর্দার আড়াল থেকে টুর্নামেন্টের ফলাফল প্রভাবিত করেছিলেন।

১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা-পেরু ম্যাচের রহস্য

ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অধ্যাপক রানান রেইন সম্মেলনে দাবি করেন, ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বিতর্কিত ৬-০ গোলের জয়ের পেছনে সামরিক জান্তার সরাসরি প্রভাব ছিল। ফাইনালে যাওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জেতার প্রয়োজন ছিল, যা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়।

অধ্যাপক রেইন জানান, আর্জেন্টিনার সামরিক শাসকেরা এই ম্যাচটি পাতানোর জন্য অন্তত একটি বিদেশি সরকারের সাথে গোপন আঁতাত করেছিল। তিনি বলেন:

‘আর্জেন্টিনায় আমি যাদের সাথে কথা বলেছি, তাদের মতে এই ম্যাচ পাতানোর বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে এই কলঙ্ক শুধু সামরিক সরকারকেই কালিমালিপ্ত করে না, বরং সেই জাতীয় দলটিকেও ছোট করে—যারা আসলে চমৎকার ফুটবল খেলেছিল এবং নিজস্ব যোগ্যতায় বিশ্বকাপ জেতার দাবিদার ছিল।’

১৯৭৬ সালে ক্ষমতা দখল করা আর্জেন্টিনার জেনারেলরা মূলত বিশ্বজুড়ে তাদের ওপর থাকা মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা ঢাকা দিতে এবং দেশের মানুষের ক্ষোভ প্রশমন করতেই এই বিশ্বকাপকে প্রোপাগান্ডা বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।

মুসোলিনির ইশারা ও ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপ

ইতালীয় লেখক ও গবেষক মার্কো ইম্পিলিয়া সম্মেলনে একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতালির তৎকালীন ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি স্বাগতিক দলকে জেতাতে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে আনা নিশ্চিত করেছিলেন। খেলাধুলা ও রাজনীতির এই কুৎসিত মেলবন্ধন নিয়ে ইম্পিলিয়া বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন:

‘এটি সেই পুরনো গল্প: খেলাধুলা এবং রাজনীতি হচ্ছে দুই ভাই, যেখানে মাঝেমধ্যে খেলাধুলা তার অন্য ভাইয়ের (রাজনীতি) অধীনে চলে যায়।’

রাজনীতি ও ফুটবল: অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধন

ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিতর্কিত জয়ের পরপরই অবশ্য দুই দেশই ফুটবল মাঠে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে—ইতালি ১৯৩৮ সালে এবং আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালে।

বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং সম্মেলনের সহ-আয়োজক স্টিফান রিঙ্কে জানান, ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে স্বাগতিক দেশগুলোর ওপর এর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অপরিসীম। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ব্রাজিল, রাশিয়া এবং কাতারের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবশালী দেশগুলোকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া প্রমাণ করে যে, ফুটবল এবং রাজনীতি একে অপরের হাত ধরাধরি করেই চলছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ফিফার তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল জেরোম ভালকে স্বীকার করেন যে, স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর ও রাস্তাঘাটের পেছনে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের এই বিশাল টুর্নামেন্ট আয়োজনে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের চেয়ে একনায়কতান্ত্রিক সরকারের অধীনে কাজ করা অনেক সময় বেশি সহজ বা ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করে।

সূত্র: সিবিসি