ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধন, জাতীয় বাজেট উপস্থাপন-একই দিনে দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একাধিক বড় ঘটনা! তবে সেই ব্যস্ততার মাঝেও নিজেদের অস্তিত্ব জোরালোভাবেই জানান দিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ইতিহাস গড়ে উপলক্ষটা স্মরণীয়ই করে রাখল টাইগাররা। ৩ ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচের পর দ্বিতীয়টিতেও জিতে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হারাল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় অস্ট্রেলিয়া। বৃষ্টি নামার আগে ৪২ ওভারে ১৮৭ রান তুলে সফরকারীরা। এরপর ওভার কমে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান। তবে ব্যাটারদের দলগত পারফরম্যান্সে সেই লক্ষ্য টপকে ৫ উইকেটে ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ।
এদিকে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে কোনো রান না করেই লজ্জার রেকর্ড গড়ে অস্ট্রেলিয়া। স্কোরবোর্ডে কোনো রান যোগ না করেই তিন উইকেট হারায় সফরকারীরা। ওয়ানডে ইতিহাসে ১০২৪ ম্যাচ খেলে এবারই প্রথম শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর নজির গড়ে জশ ইংলিসের দল।
ইনিংসের শুরুতে চাপ তৈরি করেন তাসকিন আহমেদ। টানা দুই ম্যাচে ম্যাথু শর্টকে আউট করেন তিনি। এরপর দ্বিতীয় ওভারে কুপার কনোলিকে লিটনের হাতে ক্যাচ বানিয়ে ফেরান মোস্তাফিজুর রহমান। একই ওভারে ম্যাট রেনশও আউট হন। পরে অ্যালেক্স ক্যারি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করলেও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে অস্ট্রেলিয়া।
১৮তম ওভারে জশ ইংলিসকে আউট করেন তানভীর ইসলাম। ৮১ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় সফরকারীরা। সেই অবস্থায় সপ্তম উইকেটে ১০৩ রানের জুটি গড়ে দলকে সামলান জেভিয়ার বার্টলেট ও মার্নাস লাবুশেন। তবে ৪১তম ওভারে আবারও ধাক্কা খায় অস্ট্রেলিয়া। তাসকিনের জোড়া আঘাতের পর ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান করে অস্ট্রেলিয়া।
এরপর বৃষ্টির কারণে দীর্ঘ সময় খেলা বন্ধ থাকে। পরে ডাকওয়ার্থ–লুইস–স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে ম্যাচ ৪১ ওভারে নামিয়ে আনা হয়। এতে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২ রান। বাংলাদেশের হয়ে তাসকিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান তিনটি করে উইকেট নেন, তানভীর ইসলাম নেন দুই উইকেট।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে প্রথম ওভারেই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। গুড লেন্থে পড়া বলে স্ট্রেইট ড্রাইভ খেলতে গিয়ে বোলারের হাতে ফিরতি ক্যাচ দেন তানজিদ তামিম। এরপর শান্তকে নিয়ে দলের হাল ধরেন ওপেনার সৌম্য সরকার। দুই ব্যাটার মিলে গড়েন ৮৬ রানের জুটি। তবে রির্ভাস সুইপ খেলতে গিয়ে ৪২ রানে কাটা পড়েন সৌম্য।
৮৬ রানে দুই উইকেট হারানো বাংলাদেশের বিপদ বাড়ান শান্ত। ৯৮ রানের মাথায় ৪২ করে প্যাভিলিয়নে ফিরেন টাইগারদের সহ-অধিনায়ক। আউট হওয়ার আগে অবশ্য নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। দেশের ১১তম ব্যাটার হিসেবে ওয়ানডেতে দুই হাজার রান করেন শান্ত, যা বাংলাদেশের হয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম।
মিরপুরে লিটনের ওয়ানডে পরিসংখ্যান ভালো নয়। প্রায় এক যুগের ক্যারিয়ারে করতে পারেননি কোনো ফিফটি। আজকের ম্যাচেও হলো একই দশা। দারুণ খেলতে থাকা লিটন আটকে গেলেন মিরপুরের ধাঁধায়। ক্যামরুন গ্রিনের আচমকা বাউন্সার লিটনের গ্লাভস ছুঁয়ে উইকেটরক্ষক ইংলিসের হাতে জমা হয়। তাতে ২১ রান করে বিদায় নেন এই ব্যাটার।
ছয়ে নামা মোসাদ্দেকের শুরুটা ছিল আত্মবিশ্বাসী। ডাউন দ্য ট্র্যাকেই এসে খেলেছেন প্রথম বল। অ্যাডাম জাম্পার ওপর বেশি চড়াও হয়েছিলেন এই ব্যাটার, হাঁকিয়েছেন তিন বাউন্ডারি। কিন্তু জাম্পার বলেই উচ্চবিলাসী শট খেলতে গিয়ে বিদায় নেন মোসাদ্দেক। ১৪৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে আচমকা ব্যাকফুটে পড়ে যায় বাংলাদেশ।
তবে ভয়কে জয় করেছেন মিরাজ-হৃদয়। ভালো বলকে সমীহ করেছেন, খারাপ বল থেকে করেছেন বাউন্ডারি আদায়। শেষ পর্যন্ত হৃদয় ৪০ ও মিরাজ ২২ রানে অপরাজিত থেকেই ম্যাচ শেষ করেন। তাতে ৩৬ বল ও ৫ উইকেট হাতে রেখেই অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার ওয়ানডে সিরিজ হারায় বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একটি করে উইকেট শিকার করেন ক্যামরুন গ্রিন, ম্যাট রেনশো, অ্যাডাম জাম্পা, জেভিয়ার বার্টলেট ও রাইলি মেরেডিথ।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৩৮ বছর পার করা বাংলাদেশ এই সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র একবারই হারাতে পেরেছিল। কার্ডিফে ২০০৫ সালে আশরাফুল হোসেনের বীরত্বপূর্ণ সেই ম্যাচের পর এবার এক সিরিজেই ২ জয় পেল বাংলাদেশ। আর সব প্রতিপক্ষ মিলিয়ে ঘরের মাঠে নিশ্চিত করল টানা ৫ সিরিজ জয়।