‘হালালা সেন্টারে’র ফাঁদে তথ্য ফাঁস শত শত মানুষের

ফেসবুকে ‘হালালা সেন্টার’ নামক একটি কথিত প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে হিল্লা বিয়ের বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে শত শত মানুষের নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য জমা দিয়েছিলেন। বিয়ের প্রক্রিয়ার বদলে কয়েক দিনের মাথায় আবেদনকারীদের জীবনবৃত্তান্ত (সিভি), ছবি, ইমেল ও ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীরা চরম সামাজিকভাবে বিব্রত ও ডিজিটাল হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এই চক্রের মূল হোতা ‘সানজিদা আক্তার’ নামের একটি ফেসবুক আইডির বিরুদ্ধে প্রতারণা ও ভুয়া তথ্য প্রচারের অভিযোগ এনে গত ৭ জুন রাজধানীর মিরপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন আবু মুছা নামে এক ব্যক্তি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় ‘সানজিদা আক্তার’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে। কিছুদিন আগে ওই আইডি থেকে হিল্লা বিয়ের (মুহাল্লিল-সংক্রান্ত) জন্য আগ্রহী পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপনে হাফেজ, আলেম, শিক্ষক, ইমাম, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আগ্রহের কথা দাবি করে ইমেইলে আবেদন পাঠাতে বলা হয়।

এর কিছুদিন পর, হঠাৎ করেই ওই একই আইডি থেকে অন্তত ৮০ জন আবেদনকারীর ইমেইল ও সিভির স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দেওয়া হয়। যেখানে ভুক্তভোগীদের নাম, পেশা, ফোন নম্বর ও ব্যক্তিগত পরিচয় দৃশ্যমান ছিল। পোস্টে দাবি করা হয়, ‘হাজার হাজার’ আবেদন থেকে ‘স্মারক হিসেবে’ এগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। এই তথ্য ফাঁসের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হলেও ভুক্তভোগীদের জন্য এটি গুরুতর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার সংকট তৈরি করেছে।

যেসব ব্যক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি। কেউ অভিযোগ করেছেন,  তাদের সিভি বা নম্বর অনুমতি ছাড়াই এই চক্রটি ব্যবহার করেছে। কেউ সন্দেহ করছেন তাদের জিমেইল বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এই তথ্য নেওয়া হয়েছে। অনেকে জানিয়েছেন, চাকরি বা অন্য কোনো প্রয়োজনে অতীতে জমা দেওয়া তথ্যভাণ্ডার থেকে তাদের ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে। 

প্রকাশিত তথ্যের কারণে অপরিচিত নম্বর থেকে অনবরত কল ও বার্তার মুখোমুখি হওয়ায় ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন এবং দ্রুত তথ্য অপসারণ ও দায়ীদের শনাক্তের দাবি জানিয়েছেন। 

এদিকে পোস্টগুলোর পেছনে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়। আইডিটির সঙ্গে কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা যাচাই করা যায়নি। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফেসবুকের ‘সানজিদা আক্তার’ আইডির বিরুদ্ধে রাজধানীর মিরপুর থানায় জিডি করা আবু মুছা জানান, কয়েক দিন ধরে ওই আইডি থেকে নানা রকম ভুয়া তথ্য ও প্রতারণামূলক পোস্ট প্রচার করা হচ্ছে। আইডির ব্যবহারকারী একজন পুরুষ বলে তার ধারণা। যদিও তিনি পরিচয়টি নিশ্চিত হতে পারেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু মুছা বলেন, ২০২৪ সালে প্রথমে তাবলিগের সাদপন্থি জিয়া বিন কাসেমের নামে একটি আইডি খোলা হয়। সেটি তার ছেলে পরিচালনা করছেন উল্লেখ করে পোস্টে বলা হয়, জিয়া কারাগারে আছেন। তাকে ছাড়ানোর জন্য টাকা প্রয়োজন। সন্দেহ হওয়ায় আমি জিয়ার পরিবারের খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তার ছেলেরা ছোট। কেউ ফেসবুক আইডি খোলেনি, টাকাও চায়নি। মজার ব্যাপার হলো, পরে এক সময় সেই ভুয়া আইডিতে ক্লিক করে দেখা যায়, সেটিই এখন সানজিদা আক্তার নামে চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি আইডি জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসায় আমার মনে হয়, এটি প্রতারণার উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে। এর মধ্যে তিনি ওই আইডি থেকে কথিত হালালা সেন্টারের নামে প্রচারণা শুরু করেন। পরে দেখি, হিল্লা বিয়েতে আগ্রহী প্রচুর মানুষের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে তিনি ফেসবুকে প্রকাশ করছেন। 

এ বিষয়ে মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ফেসবুক-সংক্রান্ত জিডি সাধারণত আমরা সাইবার সেলে পাঠিয়ে দিই। এই জিডির তদন্ত কোন পর্যায়ে আছে তা এখনই বলতে পারছি না।

সানজিদা আক্তার আইডির একটি পোস্টে কমেন্ট করেছেন নায়িম হাসান নামে এক ব্যক্তি। সেখানে তিনি বলেছেন, আইডিটি ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর খোলা হয়। একই দিনে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মুফতি জিয়া বিন কাসেম’ রাখা হয়। পরে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল নাম পরিবর্তন করে ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা– ড্রিম এক্সপ্ল্যানেশন’, একই বছরের ১০ অক্টোবর ‘মুহাদ্দিসা অপু’ এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ‘সানজিদা আক্তার’ নাম ব্যবহার করা হয়। আইডিতে ব্যবহৃত প্রোফাইল ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, সেটি একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া। একইভাবে কভার ফটোটি দোলা মল্লিক নামের আরেকটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। 

এদিকে গত ৮ জুন রাতে ওই আইডি থেকে করা একটি পোস্টে বলা হয়, ‘বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশ আমাকে গ্ৰেপ্তার করছে। বর্তমানে আমি উত্তরা থানাতে আছি। আল্লাহ সহায় হোন।’ এ ঘটনাটি যাচাই করে দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের দাবি সঠিক নয়। উত্তরা পূর্ব ও পশ্চিম থানায় যোগাযোগ করে এমন তথ্য মেলেনি।