ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এখন পর্যন্ত একটা বড় ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। ধারণাটা ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক সামরিক শক্তি দিয়ে শাস্তিমূলক হামলা চালালেই তেহরান মাথা নত করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এখন ট্রাম্প প্রশাসন আবার সেই একই পথে হাঁটছে।
ইরান আলোচনায় সময়ক্ষেপণ করছে এবং চুক্তি এড়িয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বুধবার (১০ জুন) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, ওরা আমাদের বোকা বানাচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই হামলার উদ্দেশ্য ইরানি নেতাদের স্পষ্ট বার্তা দেওয়া এবং ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অবস্থান আরও মজবুত করা। তার কথায়, যদি বোমা ফেলে আলোচনা করতে হয়, তাহলে বোমা ফেলেই আলোচনা করব।
হামলায় কী কী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হয়েছে এবং কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক নজরদারি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা এখন দেখছেন, এই হামলাগুলো ইরানের বিকল্প সীমিত করতে পারবে কি না এবং তাদের আলোচনার অবস্থান বদলাতে বাধ্য করবে কি না। কয়েকটি হামলা দক্ষিণ ইরানে হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা।
যুদ্ধে কখনো কখনো বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন ফল দিতে পারে। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই নতুন হামলা আসলে পুরোনো ব্যর্থ চক্রটাকেই আরও দীর্ঘায়িত করবে। মার্কিন বাহিনী একের পর এক ছোট ছোট সাফল্য পেলেও, সামগ্রিক কৌশলগত জয়ের পথ এখনো অস্পষ্ট।
গত তিন মাসের ঘটনা দেখে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি সামরিক চাপ দিচ্ছে, ইরানের নেতারা তত বেশি অনড় হয়ে উঠছেন। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে এই বিশ্বাস আরও গভীর হচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে আসা নিরাপদ নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি বলেছেন, হুমকি, ভয় দেখানো বা শক্তি প্রয়োগ করে স্থায়ী চুক্তি সম্ভব নয়। অর্থাৎ বোমা মেরে তাদের আলোচনার টেবিলে ফেরানো যাবে না এটাই তেহরানের বার্তা।
ট্রাম্পের হতাশা ও নতুন হামলার পেছনের কারণ
এই হামলা ইরান ইস্যুতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার শর্ত ইরান মানতে রাজি না হওয়ায় ট্রাম্প ক্রমশ অধৈর্য ও হতাশ হয়ে পড়ছেন।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে শুধু সরাসরি সামরিক চাপের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে চুক্তির টেবিলে আনা যায়। এর আগেও অন্তত দুবার কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি হুট করে সামরিক পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বুধবারের হামলার ঠিক আগে কাতারের মধ্যস্থতাকারী দল তেহরানে গিয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছিল। সেই সময়েই হামলা চালানো হয়।
ইরান কেন সাড়া দিতে পারছে না
ইরান মনে করে, তাদের হাতে এখনো বেশ কিছু শক্তিশালী চাল আছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে তারা বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি করতে পারে। এছাড়া হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের রুটও বন্ধ করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য জিম হাইমস সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চাইলে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত করতে পারে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম অনেক বেড়ে যাবে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। যদিও অর্থনৈতিক চাপ তীব্র, তবু সরকার পতনের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ কারণেই তেহরান ট্রাম্পের শর্ত মেনে নিতে নারাজ।
হঠকারী সিদ্ধান্তের বৃত্তে নিজেই বন্দি ট্রাম্প
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের বৃত্তে আটকে পড়েছেন। আরও বড় হামলা চালালে ইরানও কঠোর জবাব দিতে পারে। ফলে পারস্য উপসাগরে মার্কিন মিত্ররা ঝুঁকিতে পড়বে, তেলের সংকট দেখা দেবে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও কমবে।
এদিকে যদি ইরান মনে করে তারা এখনো হারেনি, তাহলে ট্রাম্পের পক্ষে তাদের চুক্তিতে বাধ্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।
পরিস্থিতি জটিল। হরমুজ প্রণালি ও নৌ-অবরোধ নিয়ে কোনো চুক্তি হলেও, পরমাণু কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে আরও দীর্ঘ আলোচনা লাগবে।
নতুন এই হামলা যদি কাজ না করে, তাহলে ট্রাম্পের শক্তি প্রয়োগের নীতি নিয়ে নতুন করে তীব্র সমালোচনা শুরু হবে। আপাতত দেখা যাক, এই চাপ ইরানের অবস্থানে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে।