গত বর্ষা মৌসুমে আগাম বৃষ্টিতে ভরে যায় ভবদহ এলাকায় বিলগুলো। দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এরপর বিলের কৃষকেরা ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সেচযন্ত্র দিয়ে সেচ দিয়ে বিলে বোরো আবাদের আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তারপরও ভবদহের তিন উপজেলা অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলের ৭ হাজার হেক্টরে সম্ভব হয়নি বোরো আবাদ।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের পর এলাকার কোনো বিলে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেমেন্ট) চালু না থাকায় পলি পড়ে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর বুক উঁচু হয়ে যায়। এ অবস্থায় গত জুলাই মাসের হালকা, মাঝারি ও একাধারে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে এলাকার ছোট বড় ৫২টি বিল। বিলের পানি উপচে দুই শতাধিক গ্রামে প্রবেশ করে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ।
জানা গেছে, ভবদহ এলাকায় কৃষক রয়েছে ৫০ হাজার। ২০১৬ সাল থেকে বিলে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় কৃষকেরা সেচযন্ত্র দিয়ে বিলের পানি সেচে বোরো ধান চাষ করে। ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলে চারা রোপণ কাজ। এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে মে মাস পর্যন্ত চলে ধান কাটা।
ভবদহ অঞ্চলের অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা তিনটির ভবদহ অঞ্চলে ২৪ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়। এর মধ্যে অভয়নগরে ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর, কেশবপুরে ৫ হাজার ৪০০ হেক্টর এবং মণিরামপুরে ১২ হাজার ১০৪ হেক্টর জমি আছে। এবার তিন উপজেলায় মোট ১৭ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। আর জলাবদ্ধতার কারণে ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়নি।
সূত্র জানায়, গত বছর এ অঞ্চলে ১৬ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল। গত বছরের চেয়ে এবার ১ হাজার ৪ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কারণ হিসেবে জানা গেছে, এবার ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইসগেটের ১২টি গেট খোলা ছিল। ফলে গতবারের চেয়ে এবার বেশি পানি নিষ্কাশিত হয়েছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।
নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পুনঃ খননের কাজ চলছে। এবার ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইসগেটের ১২টি গেট খোলা ছিল। এ জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়ার আগেই এলাকার বেশির ভাগ পানি দ্রুত নেমে গেছে
—পলাশ কুমার ব্যানার্জী, পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী
তবে কৃষি অফিসের ঐ হিসাবকে প্রত্যাখ্যান করে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা বলছেন ভবদহ অঞ্চলের কৃষিজমি এবং জলাবদ্ধতার যে তথ্য কৃষি অফিস দেয় তা অগ্রহণযোগ্য ও বিভ্রান্তিকর। সংগ্রাম কমিটির যুগ্মআহবায়ক গাজী আব্দুল হামিদ বলেন, প্রকৃতপক্ষে ভবদহ অঞ্চলের এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি জমিতে এবার বোরো চাষ হয়নি এবং তা অন্তত ২০ হাজার হেক্টর হবে।
অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী গ্রামের কৃষক প্রহ্লাদ দাস বলেন, কাছুরাবাদ বিলে আমার ছয় বিঘা (৪২ শতকে বিঘা) জমি আছে। সেখানে এখনো তিন ফুট জল। কোনো জমিতে এবার ইরি (বোরো) ধান হয়নি। মণিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি গ্রামের কৃষক অসীম কুমার ধরের ১২ বিঘা জমি আছে। তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগে সেচের মাধ্যমে পানি অপসারণ করে সাড়ে সাত বিঘায় বোরো আবাদ করা গেছে। পানি বেশি থাকায় বিলের নিম্নাংশের সাড়ে চার বিঘায় কোনোভাবে চাষ করা সম্ভব হয়নি। সেখানে এখনো পানি।
অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন বলেন, উপজেলার ভবদহ এলাকায় ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি আছে। এবারও বিলের পানি সেচে বোরো চাষ করেছেন কৃষকেরা। তারপরও উপজেলায় ১ হাজার ২৯০ হেক্টরে বোরো আবাদ সম্ভব হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে পুনঃ খননের কাজ চলছে। এবার ভবদহ ২১-ভেন্ট সুইসগেটের ১২টি গেট খোলা ছিল। এ জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়ার আগেই এলাকার বেশির ভাগ পানি দ্রুত নেমে গেছে।