সবেমাত্র চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি, এমন সময় উল্টো দিকের সোফা থেকে একটা কাশির শব্দ এল। মেঘনা তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন ও কোনো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক আর আমি কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক দাগী আসামি।
“আচ্ছা অনিক, বিয়ের আগে যে তুমি এত বড় ব্রাজিলের সাপোর্টার, সেটা কেন গোপন করেছিলে?”মেঘনার গলায় হালকা মেঘের গর্জন।
আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু আমতা আমতা করে বললাম, “লুকাবো কেন? আমাদের বিয়েটা হলো ফাল্গুন মাসে। তখন কি আর জুন-জুলাইয়ের কোপা আমেরিকা বা বিশ্বকাপের হাওয়া ছিল? আর তুমিই বা কখন জিজ্ঞেস করলে?”
“বাহ্! আমি জিজ্ঞেস করব কেন? যেদিন আমাদের আংটিবদল হলো, সেদিন তুমি আকাশী রঙের শার্টের ওপর একটা চকোলেট কালারের ব্লেজার পরেছিলে না?”মেঘনার যুক্তি যেন নিখুঁত স্ট্রাইকারের শট।
“তাতে কী হলো?”
“কী আর হবে! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি মনের দিক থেকে আকাশী-সাদা আর্জেন্টিনার মানুষ। ওই চকোলেট কালারটাকে আমি ইগনোর করেছি। বাসর রাতে যখন আলমারি খুলে দেখলাম তোমার সব গেঞ্জি আর ট্রাউজার হলুদ-সবুজ, সেদিনই আমার কপালে হাত উঠেছিল।”
আমি মনে মনে হাসলাম। পোশাকে পোশাকে যারা ফুটবল দল খোঁজে, তাদের ফুটবলীয় দর্শন আর কতটুকুই বা গভীর! পরিস্থিতি শান্ত করতে শান্ত গলায় বললাম, “আরে ধুর! দল যে যার যার, ভালোবাসা তো এক। আমি ব্রাজিলের ফ্যান হতে পারি, কিন্তু পরমতসহিষ্ণুতায় আমি একদম এক নম্বর। এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না।”
মেঘনা আর কিছু বলল না। তবে ও যেভাবে আমার দিকে তাকাল, মনে হলো ম্যাচের শুরুতেই আমাকে রেফারি দিয়ে রেড কার্ড খাইয়ে মাঠের বাইরে বের করে দেবে। ল্যাং খাওয়ার ভয়ে আমি জলদি ড্রয়িংরুম ছেড়ে নিজের পড়ার ঘরে এসে আশ্রয় নিলাম।
পরের দিন অফিস থেকে ফিরে কলিংবেল চাপলাম। মেঘনা দরজা খুলতেই আমার মনে হলো আমি ভুল করে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের কোনো স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়েছি।
পুরো ঘর আকাশী আর সাদা রঙের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। সোফার কুশনগুলো আকাশী, বিছানার চাদর ধবধবে সাদা আর তার ওপর আকাশী স্ট্রাইপ। এমনকি রান্নাঘরের চায়ের মগ থেকে শুরু করে ডাইনিং টেবিলের ম্যাট—সবকিছুতেই ম্যারাডোনা-মেসির দেশের রঙের ছোঁয়া।
আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। চরম ধৈর্য ধরে বললাম, “বাহ্! ইন্টেরিয়র চেঞ্জ করেছ দেখছি। তা, আমার জন্য কি ছোট্ট একটা কোণ পাওয়া যাবে? ওই চার স্কয়ার ফিটের মতো একটা জায়গা। একটা পেলের ছবি আর একটা ব্রাজিলের লোগো ঝোলাতাম। নিচে লেখা থাকবে 'জোগো বোনিতো'...“
“দুঃখিত জনাব,“মেঘনা মুচকি হেসে বলল, “আমাদের এই গ্যালারিতে আর কোনো সিট ফাঁকা নেই। সব টিকিট সোল্ড আউট।”
এবার আমার পাঁচবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের ফ্যান হওয়ার অহংকার আর পুরুষালি ইগো—দুটোই একসাথে চড়া দিয়ে উঠল। বুক চিতিয়ে বললাম, “যে বাড়িতে পেলের ঐতিহ্য আর নেইমারের শিল্পের কোনো জায়গা নেই, সে বাড়িতে এই অনিকও আর এক মুহূর্ত থাকবে না! আমি চললাম।”
আমি ভেবেছিলাম মেঘনা হয়তো কেঁদে কেটে আমাকে আটকাবে। কিন্তু ও উল্টো আলমারি থেকে আমার ট্রাভেল ব্যাগটা টেনে বের করে দিয়ে বলল, “যাক, বাঁচা গেল! আমাদের ফ্ল্যাট ব্লকের সব আর্জেন্টিনার ভাবিদের দাওয়াত দিয়েছি। সবাই মিলে একসাথে খেলা দেখব আর ভাঙড়া নাচব। তুমি বরং জলদি একটা রাইড শেয়ারিং বাইক ডেকে নাও।”
খেলা শুরু হতে এখনো এক সপ্তাহ বাকি। এখনই যদি এই টর্নেডো চলে, তবে টুর্নামেন্ট শুরু হলে আমার পিঠে কয়টা গোল খাবে, তা উপরওয়ালাই জানেন। অগত্যা তল্পিতল্পা গুটিয়ে রওনা দিলাম আমার লড়াকু ব্রাজিলিয়ান ফ্রেন্ড সাজিদের বাসার উদ্দেশ্যে। ঠিক করেছি, পুরো সিজনটা দুই বন্ধু মিলে হৈচৈ করে খেলা দেখব।
সাজিদের ফ্ল্যাটে নক করতেই ও যখন দরজা খুলল, ওকে দেখে মনে হলো ও কোনো বড়সড় যুদ্ধক্ষেত্রে হেরে সদ্য ফিরেছে।
“কী রে সাজিদ? ব্যাগপত্র গোছাচ্ছিস কেন? কোথাও যাচ্ছিস নাকি?”আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
সাজিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোর ভাবির ডাইরেক্ট অ্যাটাকে আমি কুপোকাত ভাই। ঘরের মাঠে ডিফেন্স বলে কিছু নেই। সারাদিন শুধু মেসির গুণগান শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। তাই ভাবছিলাম তোর বাসায় গিয়ে কয়েকটা দিন মাথা গোঁজার ঠাঁই নেব। আর তুই কি না নিজের ব্যাগ নিয়ে আমার এখানে হাজির!“
আমরা দুজনেই বুঝলাম, আমাদের বিবাহিত জীবনের ট্যাকটিক্স পুরোপুরি ফেইল করেছে। বহু আলোচনার পর আমরা আমাদের এলাকার সব ব্রাজিলিয়ান বিবাহিত বন্ধুদের ফোন দিলাম। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সবাই মিলে দুই মাসের জন্য একটা ফ্ল্যাট সাবলেট নেব। সেখানে শুধুই হলুদ-সবুজের মেলা বসবে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, মুখের কথার চেয়ে বউয়ের চোখ রাঙানির পাওয়ার অনেক বেশি। বাকি সব বন্ধুরা শেষ মুহূর্তে এসে কেউ দলবদল করে আর্জেন্টিনার সমর্থক সেজে ঘরে রয়ে গেল, কেউ বা শর্ত সাপেক্ষে বন্ড সই করে বউয়ের সাথে চুক্তি করল। স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে শেষমেশ রইলাম শুধু আমি আর সাজিদ।
পঞ্চাশ হাজার টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে দুই মাসের জন্য আমাদের স্বপ্নের 'সাম্বা কিংডম' তৈরি হলো। রাতে খাটে শুয়ে শুয়ে ভাবছি—আর্জেন্টিনা যেদিন গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেবে, সেদিন ব্যান্ড পার্টি ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে মেঘনার সামনে 'ওয়াকা ওয়াকা' বাজিয়ে নাচব। ওহ, কী আনন্দই না হবে!
ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মেঘনার নাম।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মেঘনার অত্যন্ত শান্ত, মধুর এবং অতি-মানবিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো অনিক, রাগ করে চলে গেলে, নিজের শরীরের খেয়াল রাখছ তো? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছ?”
বউয়ের মুখে এমন মধু শুনে আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। একটু আমতা আমতা করে বললাম, “হ্যাঁ... মানে, সাজিদ রান্না করছে। আমরা ভালোই আছি। তুমি হুট করে ফোন করলে যে?”
মেঘনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আসলে একা একা লাগছিল। তাই ভাবলাম ঘরটা আবার একটু গুছিয়ে ফেলি। তোমার চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিয়েছি। তাই তোমার স্মৃতি হিসেবে ড্রয়িংরুমের ওই আকাশী-সাদা পর্দার ঠিক মাঝখানে তোমার সই করা প্রিয় ব্রাজিলের সিগনেচার জার্সিটা কেটে সুন্দর করে একটা 'পাপোশ' বানিয়ে পেতে দিয়েছি। কী যে চমৎকার মানিয়েছে!“
আমার হার্টবিট এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। “কী বললে?! আমার পাঁচ হাজার টাকা দামের অরিজিনাল থাইল্যান্ড প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ব্রাজিলের জার্সি কেটে... পাপোশ?!“
“হ্যাঁ গো,“মেঘনা আরও মিষ্টি করে বলল, “আর ওই যে তোমার ড্রয়ারে রাখা হলুদ রঙের উইন্ডব্রেকার জ্যাকেটটা ছিল না? ওটার পেছনের অংশটা কেটে আমাদের বিড়াল ‘মিন্টু’র জন্য একটা সুন্দর বিছানা বানিয়ে দিয়েছি। মিন্টু এখন মনের সুখে ব্রাজিলের ওপর পা দিয়ে ঘুমাচ্ছে।”
আমার মাথায় তখন রক্তের বাটি চড়ে গেছে। চিৎকার করে বললাম, “মেঘনা! তুমি আমার আবেগের সাথে খেলছ! আমি এক্ষুনি আসছি!“
“আরে এসো না, এসো না,“মেঘনা হাসতে হাসতে বলল, “আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের ম্যাচ তো কাল রাতে। আমি ভাবছি তোমার ওই নেইমারের সাইন করা মেমেন্টো ফুটবলটা যদি ব্রাজিল হেরে যায়, তবে ওটা দিয়ে রান্নাঘরের ময়লা ফেলার ঝুড়ি বানাবো। আর যদি চলেই আসো, তবে চুক্তি হতে পারে।”
আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। সাজিদকে বললাম, “দোস্ত, সাম্বা কিংডম তুই একাই চালা। আমার আবেগ এখানে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে!“
ব্যাগটা পিঠে নিয়ে দরজার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে ভাবলাম—ফুটবলের মাঠে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা যতই বিশ্বজয় করুক না কেন, আমাদের এই দাম্পত্যের মাঠে ট্রফিটা সব সময়ই ওই ব্ল্যাকমেইলিংয়ে ওস্তাদ বিরোধী দলের বউয়ের হাতেই শোভা পায়!