চট্টগ্রামে মা-মেয়েকে হত্যা

মাথায় আঘাত নিয়ে নিশ্চুপ পিয়াস, মা আর ব্যথা সারাতে আসবেন না

মাথায় সদ্য আঘাতের চিহৃ ঢেকে গেছে সাদা ব্যান্ডেজে। চোখ দুটি নিচের দিকে যেন আটকে আছে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে। তার চারপাশে স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু তাকে ঘিরে কেন এতো ভিড়— সেটা বোঝার বয়সও হয়নি পিয়াস বড়ুয়ার। পাঁচ বছরের এই শিশুটি হয়তো ভাবছে, কিছুক্ষণ পরেই মা এসে তাকে কোলে তুলে নেবেন। কিন্তু সে জানে না, তার সেই অপেক্ষা আর কোনোদিন শেষ হবে না।

শনিবার (১৩ জুন) রাতে এক নৃশংস হামলায় প্রাণ হারান পিয়াসের মা এনি বড়ুয়া (৪০) ও বড় বোন প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬)। হামলায় আহত হয় পিয়াসও। চিকিৎসা শেষে এখন সে স্বজনদের কাছে আছে। কিন্তু বয়সের কারণে সে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি, তার জীবনে কত বড় শূন্যতা নেমে এসেছে।

ঘটনার পরের ঘটনাস্থল আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিজের ঘরের সামনে বড় চাচির কোলে বসে মোবাইল ফোনে সময় কাটাচ্ছে পিয়াস। চারপাশে মানুষের ভিড়, কান্না আর শোকের আবহ। অথচ শিশুটির মুখে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই। কারণ সে এখনও জানে না, যে মানুষটি তাকে খাইয়ে দিতেন, ঘুম পাড়িয়ে দিতেন, অসুস্থ হলে সারারাত জেগে থাকতেন—সেই মা আর কখনও ফিরে আসবেন না।

পিয়াসের প্রতিবেশীদের ভাষ্য, পিয়াস ছিল মায়ের খুব আদরের সন্তান। সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গেই থাকত সে। এখন সেই শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। তাদের প্রশ্ন, এত অল্প বয়সে মা ও বোনকে হারানো এই শিশুর দায়িত্ব কে নেবে? কে মুছে দেবে তার জীবনের এই গভীর ক্ষত?

পিয়াসের বাবা সুজন বড়ুয়া বলেন, আমি নাইটগার্ডের কাজ করি। ঘটনার সময় কাজেই ছিলাম। প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে ঘরে ছুটে আসি। মা ছাড়া পিয়াসকে আমি কীভাবে রাখবো?

এদিকে নৃশংসভাবে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িতের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। খবর পেয়ে রোববার দুপুরে আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে তিনি এ কথা বলেন।

চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরাসহ এএসপি আনোয়ারা, চট্টগ্রামের ডিবি পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আমরা যা জানতে পারলাম, নিহতদের পরিচিত কেউ রাতের বেলায় পিছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস ঘটনা ঘটায়। আমরা এখানে এসে যা বুঝলাম তা-থেকে হত্যাকারী সম্পর্কে আমাদের ধারণা তৈরি হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত তাকে ধরতে সক্ষম হবো। তারপরই ঘটনার মূল কারণ জানতে পারবো তবে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কারণে এই ঘটনা ঘটেছে।

এসময় এএসপি পরিদর্শনের কথা শুনে ঘটনাস্থলে ভিড় জমায় নিহত প্রিয়ন্তী বড়ুয়া (১৬) এর সহপাঠীরা। তারা হত্যাকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য এএসপির কাছে দাবি জানান। 

কান্নারত অবস্থায় উম্মে ফাতিমা নামের এক সহপাঠী জানান, ‘প্রিয়ন্তী সব সময় হাসিখুশি থাকতো, তার পরিবারের কোনো সমস্যার কথা আমাদের কখনও শেয়ার করেনি। কোরবানির সময় সে তাদের ঘরে গরুর মাংস আনতে বলছিলো আমি আনতে পারিনি এখন আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি আমার বান্ধবীর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

উল্লেখ্য, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ০৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়া পাড়া এলাকা থেকে মা-মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।