স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

বাজেট বরাদ্দের স্বচ্ছ বাস্তবায়নই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

বাজেট বাস্তবায়নে প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, জটিল ক্রয়প্রক্রিয়া, দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে বরাদ্দের বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ এর পূর্ণ সুফল পায় না। স্বাস্থ্য খাতের এই সফলতার জন্য সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, এবার বাজেটে ২৭ হাজার কোটি টাকার একটা থোক বরাদ্দ বেড়েছে। তবে রেগুলার বাজেট যেটা, সেটা বাড়ে নাই। সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে তখন অপারেটিং বাজেট বাড়ানোর মতো তারা সময় পায় নাই। সে কারণে তারা থোক বরাদ্দ বাড়িয়ে রেখেছে। এখন পরিকল্পনা করে অর্থটাকে কাজে লাগালে—এই অর্থবৃদ্ধিটা চমত্কার একটা ব্যাপার হবে। তবে  বাজেটের এই বিশাল বরাদ্দের পুরোপুরি স্বচ্ছ বাস্তবায়নই এখন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু যদি আগের ধারাবাহিকতায় শুধু কেনাকাটা এবং বিল্ডিং তৈরি—অর্থাৎ যেসব জায়গায় বিশাল দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে, সেখানে অর্থ ব্যয় করে, তাহলে এই অর্থ বরাদ্দটা অর্থহীন হয়ে যাবে। সরকারের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে—তারা কোন পথে হাঁটবে—আগের সেই কর্দমাক্ত জটিল এবং দুর্নীতির পথে হাঁটবে; না কি জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্যে একটি নতুন পথ তৈরি করে স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বাজেট বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে নানা কথা রয়েছে এবং এটি আসলেই বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই এই বাজেটকে জনতুষ্টির বাজেট বলছেন, তবে আমরা বলব এটি জন-আকাঙ্ক্ষার বাজেট। স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্যের কথা স্বীকার করে ডা. এম এ মুহিত বলেন, সাধারণ মানুষ হাসপাতালে ঢুকতেই দালাল, বাটপার ও বিভিন্ন কোম্পানির খপ্পরে পড়ে হেনস্তার শিকার হচ্ছে। এছাড়া আউটসোর্সিং স্টাফ ও নিয়মিত স্টাফদের চেনা মুশকিল হয়ে পড়েছে, যা হাসপাতালে এক ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করেছে। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সক, নার্স ও কর্মচারীদের চরম ঘাটতি রয়েছে; যেখানে ১০ জন থাকার কথা, সেখানে আছে মাত্র পাঁচ জন।

ওষুধ ও পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষ আশা করে হাসপাতালে গেলে ডাক্তার পাঁচটা ওষুধ লিখলে অন্তত দুইটা যেন বিনা মূল্যে পায়, কিন্তু তা পাওয়া যায় না। চারটা টেস্টের মধ্যে দুইটা টেস্ট বিনা মূল্যে করার সুযোগ মানুষ চায়। আমরা এই বর্তমান অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণ চাই। বাংলাদেশ এখন আর পরমুখাপেক্ষী কিংবা অনুদান নির্ভর দেশ নয় উল্লেখ করে তিনি দেশের ভেতরের রিসোর্স, মেধা ও দীর্ঘদিনের সফলতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। গতকাল স্বাস্থ্যখাতের বাজেট নিয়ে এক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ ইত্তেফাককে বলেন, বাজেট বাড়া দরকার ছিল, সেটা বেড়েছে, আমরা খুশি। বাজেটে ২৭ হাজার কোটি টাকার একটা থোক বরাদ্দ বেড়েছে। স্বাস্থ্যখাতটা নির্ভর করবে এই থোক বরাদ্দটা কীভাবে ব্যয় হবে—তার ওপর। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে যে কমিটমেন্টগুলো ছিল, সেগুলো তারা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবে, এই থোক বরাদ্দ থেকে। বাজেট থেকে সাধারণ মানুষ কি পাবে তা নির্ভর করবে—থোক বরাদ্দটা কতটা ব্যবহার করা হলো; তার কত অংশ ইফেকটিভভাবে ব্যবহার করা হলো। এখন সরকার যত তাড়াতাড়ি প্রজেক্ট প্রণয়ন করতে পারবে, সরকার তত তাড়াতাড়ি এই থোক বরাদ্দের টাকাটা ব্যয়ের সুযোগ পাবেন।

এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারের উচিত হবে জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, এখন থেকে তাকে প্রস্তুতি নেওয়া—টাকাটা খরচ করার জন্যে। এর জন্যে প্রকল্প গ্রহণ, প্রকল্প প্রণয়ন এবং প্রকল্প অনুমোদনের জন্যে কাজ শুরু করে দেওয়া। এ জন্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে বেশি সময় নাই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের দেশের মানুষের চিকিত্সা ব্যয়ের ব্যক্তিগত খরচ ৭৯ শতাংশ। কিন্তু এটি হওয়া দরকার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে। তাহলে কোন খাতটায় বেশি অর্থ দরকার। একটা হচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার পরে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ করা হয় না, সরকারি হাসপাতালে যে অপারেশনগুলো করা হয়, তার জন্যে সমস্ত ওষুধ রোগীকে বাইরে থেকে কিনতে হয় এবং পরীক্ষানিরীক্ষার একটি বড় অংশ বাইরে থেকে করাতে হয়। তাহলে যারা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে চিকিত্সাসেবা নিবে, তাদের চিকিত্সাটা অন্তত ১০০ ভাগ না হলেও ৯০ ভাগ সরকারি অর্থে চিকিত্সা দেওয়া যায়। তাহলে যারা চিকিত্সা নিবে, তাদের চিকিত্সা অর্থবহ হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যয়ের জায়গাটি উন্মোচিত হয়।

দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে এখনো চিকিত্সা খাতে ডাক্তার, নার্স এবং টেকনোলজিস্ট সংকট। যেখানে একজন ডাক্তারের বিপরীতে তিন জন নার্স আর পাঁচ জন টেকনোলজিস্ট থাকতে হয়; আমরা এই রেসিওর একেবারে উলটোদিকে অবস্থান করছি। তাহলে এই দক্ষ জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য একটি পরিকল্পিত কাজ শুরু করতে হবে। যদি সেই কাজটি শুরু করা যায় তাহলে অর্থের প্রয়োজন হবে। আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালগুলোকে—প্রাথমিক স্তরের চিকিত্সাসেবার মূল ভিত্তি হওয়া দরকার। কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত দেখি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালের অধিকাংশ রোগীকে নানা লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবে জেলা বা কেন্দ্রীয় হাসপাতালগুলোতে রেফার করা হয়। যদি কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা করে, উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালগুলোকে চিকিত্সার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে কিন্তু বিশাল অংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে। এভাবে পরিকল্পনা করে অর্থটাকে কাজে লাগালে—এই অর্থবৃদ্ধিটা চমত্কার একটা ব্যাপার হবে মন্তব্য করেন এই জনস্বাস্থ্যবিদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, এবারের প্রস্তাবিত বাজেট স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে এটিই সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং বিগত সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তবে বরাদ্দের অঙ্ক বড় হলেও অতীতে উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড খুব একটা উত্সাহব্যঞ্জক নয়। ফলে কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষ এর পূর্ণ সুফল পায় না। স্বাস্থ্য খাতের এই সফলতার জন্য সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।