সুন্দরবনের ঘন সবুজ বনভূমি কিংবা লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্টের ছায়াঘেরা পথ ধরে হাঁটতে গেলে হয়তো দেখা মিলবে এক ব্যতিক্রমী মানুষের। কাঁধে ক্যামেরা, হাতে গিটার, মুখে চিরচেনা হাসি—তিনি সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ তমাল। উদ্যোক্তা, কর্পোরেট নেতা, নীতিনির্ধারক—সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি একজন প্রকৃতিপ্রেমী, যিনি নিজের দেশকে ভালোবেসে গড়ে তুলছেন টেকসই পর্যটনের এক নতুন দিগন্ত।
গত ১৭ বছর ধরে তমাল দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন খাতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। তার কাজের মূল দর্শন হলো—ব্যবসায়িক সাফল্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণ একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে, যদি থাকে দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতা।
পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা তমাল উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মার্কেটিংয়ে বিবিএ এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস-এ এমবিএ সম্পন্ন করে তিনি পর্যটন শিল্পে পা রাখেন। শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মানের সেবা এবং বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরা।
বর্তমানে তিনি মার্কেট এন-ট্রান্স হলিডেজ-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কেট এন-ট্রান্স লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ইনবাউন্ড ট্যুরিজম, অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভ্রমণ এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে অনন্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়া ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি অ্যাওয়ার্ডসে “লিডিং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অব দ্য ইয়ার” পুরস্কার অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
তবে তমালের কাজ শুধুমাত্র পর্যটন ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা উন্মোচনে তিনি ফার্মার্স অ্যাগ্রোর অংশীদার হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে থাইল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল ফিয়াথাই ২ এবং সামিতিভেজ-এর মতো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা ভ্রমণ সহজতর করতেও ভূমিকা রাখছেন।
তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি কর্পোরেট অর্জনের বাইরে। গত ১৫ বছর ধরে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং বিনামূল্যে তিনি দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ইকোট্যুরিজম, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি ইতোমধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের প্রকৃতি রক্ষক।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে তিনি সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে একমাত্র বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করছেন। বিশেষ করে আরিয়াল বিলের মতো সংবেদনশীল পরিবেশগত অঞ্চল সংরক্ষণে তাঁর মতামত ও পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।
একই সঙ্গে তিনি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ-এ খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন। আইটিবি ইন্ডিয়ায় ট্রাভেল টেকনোলজি নিয়ে বক্তব্য প্রদান থেকে শুরু করে সোশ্যাল বিজনেস ডেতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একই মঞ্চে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন।
আগামী দিনের জন্য তমালের স্বপ্ন আরও বড়। তিনি চান, বাংলাদেশে কম-প্রভাবসম্পন্ন এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে তৈরি হোক “ইয়াং ট্যুরিজম অ্যান্ড নেচার অ্যাম্বাসেডর” নেটওয়ার্ক, যারা প্রকৃতি সংরক্ষণ ও দায়িত্বশীল ভ্রমণের বার্তা ছড়িয়ে দেবে।
সৈয়দ শাফাত উদ্দিন আহমেদ তমালের বিশ্বাস, প্রকৃত সাফল্য কখনোই স্বল্পমেয়াদি হয় না। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। তাই তিনি শুধু পর্যটন গন্তব্যের প্রচার করছেন না; তিনি নির্মাণ করছেন একটি টেকসই ভবিষ্যৎ, যেখানে বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত থাকবে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের এই পথিকৃৎ প্রমাণ করেছেন, একজন উদ্যোক্তা চাইলে ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি পরিবেশ ও সমাজের জন্যও স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। আর সেই কারণেই তিনি শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, বরং বাংলাদেশের টেকসই পর্যটন আন্দোলনের একজন অনুপ্রেরণাদায়ক মুখ।