বিশ্বকাপের মঞ্চে কিছু দল আসে অংশ নিতে, কিছু দল আসে নিজেদের প্রমাণ করতে, আর কিছু দল আসে ইতিহাস লিখতে। ফ্রান্স সেই তৃতীয় দলের নাম। দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চোখে এবারও একটাই লক্ষ্য-সোনালি ট্রফি। আর সেই স্বপ্নের রথের সারথি কিলিয়ান এমবাপ্পে, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন।
নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ফরাসিদের নতুন বিশ্বকাপ মিশন। 'আই' গ্রুপের এই ম্যাচটি মাঠে গড়াবে আজ রাত ১টায়। ফ্রান্সের বর্তমান দলটি যেন তারার মেলা। আক্রমণে এমবাপ্পে, ডেম্বেলে, অলিসে ও থুরাম; মাঝমাঠে অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতার মিশেল; রক্ষণে দৃঢ়তা। কোচ দিদিয়ের দেশমের হাতে রয়েছে এমন একটি দল, যারা যে কোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে। শক্তি, গতি, কৌশল এবং গভীরতা-সবমিলিয়ে ফ্রান্সকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে এই নীল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে একজনই-কিলিয়ান এমবাপ্পে। ২০১৮ সালে তিনি ছিলেন বিস্ময় বালক। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জিতে পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ফুটবলের ভবিষ্যৎ এসে গেছে। ২০২২ সালে গোল্ডেন বুট জিতে প্রমাণ করেছিলেন, তিনি শুধু ভবিষ্যৎ নন, বর্তমানেরও রাজা। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ইতিহাসের দরজায়।
এমবাপ্পে এখন আর শুধু একজন ফরোয়ার্ড নন; তিনি ফ্রান্সের নেতা, অনুপ্রেরণা এবং সবচেয়ে বড় আশা। তার পায়ে বল মানেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য তার গতি এক দুঃস্বপ্ন, আর গোলমুখে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিশ্বসেরাদের পর্যায়ে। জাতীয় দলের হয়ে ইতিমধ্যেই অর্ধশতাধিক গোল করা এই তারকা বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নিজের নাম খোদাই করে ফেলেছেন। ১২ গোল নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন সর্বকালের সেরা গোলদাতাদের তালিকার দিকে। প্রতিটি বিশ্বকাপে তিনি যেন নতুন করে নিজের কিংবদন্তি রচনা করেন। ফ্রান্সের স্বপ্নও তাই এমবাপ্পেকে ঘিরেই। কারণ বড় মঞ্চে বড় তারকারাই পার্থক্য গড়ে দেয়। ২০২২ সালের ফাইনালের হ্যাটট্রিক আজও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। যদিও সেদিন ট্রফি ছুঁতে পারেননি, সেই অপূর্ণতাই হয়তো আজ তার সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
অন্যদিকে সেনেগালও কোনো সাধারণ প্রতিপক্ষ নয়। ২০০২ সালে তখনকার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে যে ইতিহাস তারা লিখেছিল, তার স্মৃতি আজও অমলিন। ফ্রান্স ও সেনেগালের মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানও বেশ চমকপ্রদ। দুই দল মোট তিন বার একে অপরের বিপক্ষে খেলেছে। সেখানে ফ্রান্সের জয় মাত্র একটি, আর সেনেগালের জয় দুটি।
সবচেয়ে স্মরণীয় সেই জয়টি অবশ্যই ২০০২ বিশ্বকাপে, যেখানে পাপা বুবা দিয়পের গোলেই কেঁপে উঠেছিল ফুটবল দুনিয়া। এবার দুই যুগ আগের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের পুনাবৃত্তি করতে আর প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে আছে ফরাসিরা সিংহরা আবারও অঘটনের স্বপ্ন দেখলেও সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরো পরিণত, আরও এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপের আকাশে অনেক নক্ষত্র কিন্তু ধ্রুবতারা হয়ে ওঠে খুব কমজন। এমবাপ্পে সেই পথেই হাঁটছেন। ২০১৮-তে ছিলেন বিস্ময়, ২০২২-এ গোলের রাজা, আর ২০২৬-এ তিনি হয়তো খুঁজছেন অমরত্বের ঠিকানা। চায় সেনেগাল। তবে তেরাঙ্গার এবার তাদের ক্ষুধার্ত এক জন্ম নেয়, ফ্রান্স চায় তৃতীয় বিশ্বকাপ। এমবাপ্পে চান ইতিহাসের সিংহাসনে আরও উঁচু আসন। তাই সেনেগালের বিপক্ষে প্রথম বাঁশি বাজতেই শুরু হবে শুধু একটি ম্যাচ নয়; শুরু হবে এক মহাকাব্যের নতুন অধ্যায়।