বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত দল ইরান: ইরানের কোচ

কারাগারে বন্দীদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার একটা ব্যবস্থা আছে। যেটি হচ্ছে, অল্প সময়ের জন্য জেলের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয় শর্ত সাপেক্ষে। ইরানের অবস্থা ঠিক তেমন। দাগি অপরাধীদের মতো ‘যুদ্ধ’ শেষে একরকম তড়িঘড়ি করে আবার যেন ফেরানো হচ্ছে গারদে। নিউজিল্যান্ডের ম্যাচের পর এ নিয়ে ক্ষোভটা জানিয়েছেন ইরানের কোচ আমির গালেনোই। বলছেন, বিশ্বকাপে সম্ভবত তারাই ‘সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত দল’।

লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে ইরান। কিন্তু ম্যাচ শেষেই তাদের লস অ্যাঞ্জেলেস ছেড়ে তড়িঘড়ি করে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অবস্থিত ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

শুরুতে পরিকল্পনা ছিল, প্রতিটি ম্যাচের দুই দিন আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রে যাবে এবং ম্যাচের পরদিন ফিরে আসবে। পরে ফিফা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে দিনে গিয়ে দিনে ফিরতে হবে ইরানকে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনার পর ফিফা জানায়, ম্যাচের আগের দিন এসে ম্যাচ শেষে আবার চলে যেতে হবে। শুরুতে ইরানের মূল অনুশীলন ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ার কথা থাকলেও সেটি বদলে নিয়ে যাওয়া হয় মেক্সিকোতে।

ম্যাচ শেষে এসব নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন গালেনোই, ‘আমরা যাতায়াতেই এত সময় আকাশে কাটিয়েছি যে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগই পাইনি। আজকের ম্যাচের পর আমাদের বলা হয়েছে, “আপনাদের এখনই চলে যেতে হবে।” তিনি যোগ করেন, ‘রিকভারির জন্য সময় পাওয়া আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের বলা হয়েছে, তিহুয়ানার ক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে, আর এটা আমাদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনে হয়, পুরো বিশ্বকাপের মধ্যে সম্ভবত আমরাই সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত দল।’

তবে গালেনোই স্পষ্ট করেননি, ঠিক কে তাদের সোমবার রাতেই চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। যদিও ইরানের অধিনায়ক মেহদি তারেমি জানান, ম্যাচের পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ড্রেসিংরুমে এসে দলের সঙ্গে দেখা করেছেন। তারেমি বলেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি আমাদের সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিষয়টি আরও অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িত। সবাই জানে ব্যাপারটা কী। এ নিয়ে আমার আলাদা করে কিছু বলার দরকার নেই। কারণ, আপনারা জানেন আমরা কোন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আমাদের জন্য সবকিছুই যেন একধরনের বিপর্যয়।’

তারেমি ও গালেনোই-দুজনই ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ এবং দলের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের অনুমতি পাননি। মাসের পর মাস ধরে চলা উত্তেজনা এবং তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার পর, ইরান এমন একটি দেশের আয়োজিত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রথম দল, যার সঙ্গে তাদের যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান।

আর এ বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় লস অ্যাঞ্জেলেসের উপকণ্ঠে, যে শহরে ইরানের বাইরে সবচেয়ে বড় ইরানি জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তাদের অনেকেই সেখানে অভিবাসী হিসেবে গিয়েছিলেন। ফলে ম্যাচটিকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। ইরানের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় স্টেডিয়ামে যেমন জোরালো উল্লাস শোনা গেছে, তেমনি স্পষ্ট দুয়োধ্বনিও শোনা গেছে। তবে খেলা শুরু হওয়ার পর ৭০ হাজার ১০৮ দর্শকের বড় অংশই ইরান দলকে প্রবল সমর্থন দিয়েছে।

ব্যাপারটা ইরান কোচের চোখ এড়ায়নি, ‘এখানে অনেক ইরানি উপস্থিত ছিলেন। তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশ্বাস ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তারা সবাই আন্তরিকভাবে আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন। আমার মনে হয়, এটা আমাদের সবার জন্যই একধরনের বিজয়।’ নানাভাবে ফিফা ইরানের দর্শকদের আটকানোর চেষ্টা করলেও ইরানের বিপ্লব-পূর্ব ‘সিংহ ও সূর্য’ প্রতীকের পতাকা মাঠে দেখা গেছে অনেক। যদিও ফিফা এই পতাকা আনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

কোথাও ইরানের আগের পতাকার পাশে ইসরায়েলের পতাকাও দেখা গেছে। রোববার ইরানের পরের ম্যাচের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। এরপর ২৬ জুন সিয়াটলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ হবে মিসর। বেলজিয়াম ও মিসর নিজেদের প্রথম ম্যাচ ১-১ ড্র করেছে।