আমার একটা বিশ্বাস ছিল—প্রথম ম্যাচে লিওনেল মেসি হয়তো একটা গোল করবেন আর একটা অ্যাসিস্ট করবেন। কিন্তু তিনি যে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে বসবেন, এটা সত্যিই কল্পনাতীত ছিল। সেটাও এই ৩৮ বছর বয়সে এসে, বিশ্বকাপের নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক! অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়।
প্রথম ম্যাচেই এই হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬ গোল) ছুঁয়ে ফেলেছেন তিনি। সামনে আরও ম্যাচ রয়েছে। মেসি আসলে কোথায় গিয়ে থামেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পেও প্রথম ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ১৪-এ। এবারের বিশ্বকাপে মেসি আর এমবাপ্পের মধ্যে একটা রোমাঞ্চকর লড়াই হয়তো আমরা দেখতে পাব।
কাতারে আমরা যে জাদুকরি মেসিকে দেখেছি, সেই একই খিদে ও স্কিল ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসেও দেখতে পাওয়াটা আমাদের মতো পেশাদার ফুটবলারদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণার। ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল তার বাঁ পা-টা এখনো সেই তরুণ বয়সের মতোই ধারালো। এ কারণেই আসলে তাকে ‘গোট’ বলা হয়। মেসি যখন হ্যাটট্রিক করছিলেন, আমার মনে হচ্ছিল পুরো বুয়েনস এইরেস যেন উল্লাসে কাঁপছে।
তার গতি, বুদ্ধিমত্তা, ফাঁকা জায়গা তৈরি করা বা চকিতে শট নেওয়ার ক্ষমতা—সবই ছিল নিখুঁত। একজন মিডফিল্ডার হিসেবে আমি দেখছিলাম প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা মেসিকে কতটা জায়গা দিচ্ছিল। মেসিকে বিন্দুমাত্র জায়গা দেওয়া মানেই যে নিশ্চিত বিপদ, তা আলজেরিয়া টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে।
মেসির এই পারফরম্যান্স আমাদের বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলারদের জন্য বড় শিক্ষা। বয়স বা চাপ কোনোটিই যে বাধা হতে পারে না, তা তিনি আবার প্রমাণ করলেন। আমাদের দেশের ছেলেদের এই ম্যাচগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে মেসির অব দ্য বল মুভমেন্ট শেখার অনেক কিছু আছে।
আমি নিজেও আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগের ক্লাব সোল দে মায়োতে খেলেছি, দেশটির ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ফলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খেলাটা আমি সব সময়ই একটু ভিন্ন চোখে দেখি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে জয় প্রত্যাশিতই ছিল। এই দলের মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনজো ফার্নান্দেজদের মধ্যে আগে থেকেই ভালো বোঝাপড়া ছিল, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও তা দেখলাম। এটা দলের জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট।
তবে একটু বাস্তববাদী হলে মনে রাখতে হবে, আর্জেন্টিনা কিন্তু গত কিছু ম্যাচ আইসল্যান্ড, হন্ডুরাস, জাম্বিয়া, মৌরিতানিয়া, অ্যাঙ্গোলা, পুয়ের্তোরিকো, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডরের মতো তুলনামূলক কম শক্তির দলের বিপক্ষে খেলেছে। ফলে দলটা এখনো ওই অর্থে বড় পরীক্ষায় পড়েনি। র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশের কোনো দলের সঙ্গে খেললে তাদের আসল শক্তি বোঝা যাবে। তাই আমি এখনই খুব উচ্ছ্বসিত না হয়ে বড় ম্যাচের অপেক্ষায় থাকব। তবে প্রথম ম্যাচে ৩-০ গোলে জয় পাওয়া অবশ্যই বড় কিছু। প্রথম ম্যাচ জয় দিয়ে শুরু করাটা কতটা স্বস্তির, তা আমি একজন অধিনায়ক হিসেবে খুব ভালো বুঝি।
অন্যদিকে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্সও ভালো শুরু করেছে। এমবাপ্পেও দেখিয়েছে যে সে একটা খাঁটি গোল মেশিন। আস্তে আস্তে এমবাপ্পে মনে হয় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোতে পরিণত হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে উসমান দেম্বেলে, এমবাপ্পে, মাইকেল অলিসে ও দেজিরে দুয়েদের নিয়ে গড়া ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগই সবার চেয়ে সেরা। তাদের বদলি বেঞ্চের শক্তির গভীরতাও বেশ ভালো। আমার তো মনে হয় এবারের দলটি ২০২২ বিশ্বকাপের চেয়েও শক্তিশালী। আশা করি, সামনের ম্যাচগুলোয় আমরা আরও রোমাঞ্চকর লড়াই দেখতে পাব।
লেখা: জামাল ভুঁইয়া
সূত্র: প্রথম আলো