এক পশলা বৃষ্টিতেই পুরোনো রূপে কক্সবাজার শহর

সন্ধ্যা ও রাতের মাঝারি বর্ষণে আবারও জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে কক্সবাজার পৌর শহর। গ্রীষ্মের শেষ দিকে নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শহরের দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রোববার (২১ জুন) মাগরিবের আজানের সময় এবং পরে রাতের বৃষ্টিতে পর্যটন শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো পানিতে তলিয়ে যায়।

জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। চরম ভোগান্তিতে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা। ড্রেন উপচে পানি সড়কে উঠে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন শহরবাসী।
রবিবার সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল। দিনের বিভিন্ন সময়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও সন্ধ্যার পর তা তীব্র আকার ধারণ করে। এক ঘণ্টার মতো টানা বৃষ্টির পর মধ্যরাতেও আবার বৃষ্টি হয়। এতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এলাকা, বার্মিজ মার্কেট, বাজারঘাটা, বিজিবি ক্যাম্প, উপজেলা বাজারসহ প্রধান সড়কগুলো হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক স্থানে সড়ক ও ড্রেনের পার্থক্য বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন হোটেল-মোটেল জোনে অবস্থানরত পর্যটকেরা। প্রধান সড়কে পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক পর্যটক হোটেলে আটকে পড়েন। কেউ কেউ সমুদ্রসৈকত থেকে ফিরে আসতে গিয়ে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্ভোগে পড়েন। স্থানীয়রাও চলাচলে সমস্যার সম্মুখীন হন।

কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসা পর্যটক সজীব আহসান বলেন, “রাজধানী ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে জলাবদ্ধতা দেখেছি, কিন্তু পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারেও এমন পরিস্থিতি দেখতে হবে ভাবিনি। রাস্তায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হাঁটু পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। এটি পর্যটকদের কাছে খুবই নেতিবাচক বার্তা দেয়।”

এদিকে বার্মিজ মার্কেট থেকে বাজারঘাটা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি জমে যায়। পৌরসভার পাড়া-মহল্লার সড়ক ও উপসড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।

লিংকরোড এলাকার বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, “শহর থেকে কাজ শেষে রাতে বাসায় ফিরছিলাম। হঠাৎ বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় বৃষ্টিতে আটকে যাই। প্রায় এক ঘণ্টা মার্কেটের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। বৃষ্টি থামার পর দেখি ড্রেন উপচে সড়কে হাঁটু পানি। বাইক চালিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।”

সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকার সোহাগ গেস্ট হাউসে অবস্থানরত আলী আমজাদ বলেন, “পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে এসেছি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। কলাতলী ও বার্মিজ মার্কেট এলাকায় হাঁটু পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে।”

শহরের বিজিবি ক্যাম্প এলাকা, গোলদিঘি, বৌদ্ধ মন্দির সড়ক, বড় বাজার, টেকপাড়া, কালুর দোকান, তারাবনিয়ারছড়া, নুরপাড়া, সমিতিপাড়া, নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, কুতুবদিয়া পাড়া ও হোটেল-মোটেল জোনসহ বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি দেখা দেয়। কয়েকটি এলাকায় বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে।

বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা হোছাইন লুতু বলেন, “সন্ধ্যার বৃষ্টির পর পুরো এলাকা পানির নিচে চলে যায়। প্রধান সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।”

টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজিজ রাসেল বলেন, “পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়ছে। অনেক নালা দখল হয়ে গেছে, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”

স্থানীয়দের মতে, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নিয়মিত পরিষ্কারের অভাবে কক্সবাজারে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

তাদের দাবি, পর্যটননির্ভর কক্সবাজার শহরের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার, খাল-নালা দখলমুক্তকরণ এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সম্প্রতি নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই লোকদেখানো ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ফটোসেশনের পরিবর্তে বাস্তব কাজ না হলে বর্ষা মৌসুমজুড়ে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।

কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।