যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশটি গত এক দশকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার পথে এগোচ্ছে। ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে একের পর এক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে ব্রিটেন। ২০১৬ সালের পর দায়িত্ব নেওয়া কোনো প্রধানমন্ত্রীই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। সোমবার (২২ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
ব্রেক্সিট গণভোট ও ক্যামেরনের বিদায়
২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে ভোট দেন ব্রিটিশরা। ফলাফল ঘোষণার পরপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করলেও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত ছিল তার সরকারেরই। এরপর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন থেরেসা মে।
থেরেসা মের কঠিন সময়
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের জন্য সংসদে শক্তিশালী অবস্থান তৈরির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন থেরেসা মে। কিন্তু উল্টো কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করলেও ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে ব্যর্থ হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন মে।
জনসনের উত্থান ও পতন
থেরেসা মের বিদায়ের পর কনজারভেটিভ পার্টির নেতৃত্বে আসেন ব্রেক্সিটপন্থী নেতা বরিস জনসন। ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান নিয়ে ২০১৯ সালের নির্বাচনে বড় জয় এনে দেন তিনি। তার নেতৃত্বেই ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে যুক্তরাজ্য।
তবে কোভিড-১৯ মহামারি, সরকারি নানা বিতর্ক এবং দলীয় অসন্তোষের কারণে জনসনের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। অবশেষে ২০২২ সালে দলের ভেতর থেকেই প্রবল চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।
লিজ ট্রাসের স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়
বরিস জনসনের উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন লিজ ট্রাস। কিন্তু তার ঘোষিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আর্থিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে মাত্র ৪৪ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি। ব্রিটেনের ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রিত্ব।
স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টায় সুনাক
২০২২ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসেবার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন তিনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ড বিষয়ক বিরোধ মেটাতেও অগ্রগতি আনেন। তবে ক্রমাগত জনসমর্থন হারাতে থাকা কনজারভেটিভ পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেননি।
লেবারের প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরে লেবার পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কিয়ের স্টারমার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি জানান, নতুন সরকার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
একই বছরের অক্টোবরে অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস ব্যাপক কর বৃদ্ধির ঘোষণা দেন, যা ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং সরকারের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রিফর্ম ইউকের উত্থান
২০২৫ সালের শুরু থেকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে। অভিবাসনবিরোধী অবস্থান ও প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনার মাধ্যমে দলটি জনমত জরিপে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে এবং একপর্যায়ে লেবার পার্টিকেও ছাড়িয়ে যায়।
স্টারমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি
২০২৬ সালের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে লেবার পার্টির হতাশাজনক ফলাফল স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। সরকারের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি জানান।
এর কিছুদিন পর প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।
এমন পরিস্থিতিতে কিয়ের স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবারও শুরু হয়েছে নতুন নেতৃত্বের খোঁজ। গত এক দশকের ধারাবাহিক নেতৃত্ব সংকটের পর এবার নতুন প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।