দুই বছরে স্বল্পমূল্যে ১৬৮ একর জমি কেনে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পরিবার, রাজ্যজুড়ে তোলপাড়

বিজেপিশাসিত ভারতের মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ৬১ বছর বয়সী মোহন যাদবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়। এদিকে এই অভিযোগ উঠার পর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। 

জানা যায়, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৫ সালে সারাদেশে ১০০টি স্মার্ট সিটি তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই ওইসব শহরের জমির দাম মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এসময় প্রকল্পের আঁচ আগাম জানার দরুন জমিবাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সস্তায় জমি কেনা শুরু করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। পরে প্রকল্প ঘোষণার ফলে তারা বিপুল লাভ করেন। সেই ১০০টি শহরের মধ্যে উজ্জয়িনীও ছিল। যদিও এতকাল তার উন্নয়নে মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়নি।

পরে মোহন যাদব মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ঠিক আগে সেই মাস্টার প্ল্যান তৈরি হয়। ২০২৩ সালে বিধানসভার নির্বাচনের পর মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন। মুখ্যমন্ত্রিত্ব লাভের পর মোহন যাদব, তার পরিবার ও নিকটাত্মীয়রা ১৬৮ একর জমির ওপর মোট ১৩৭টি প্লট কিনেছেন মাত্র ৪৫ কোটি রুপি খরচ করে। ওইসব জমি কেনা হয় বড় বড় রাস্তা, হাইওয়ে ও নানান অবকাঠামোর আশেপাশে যেসব জায়গায় উন্নয়ন হওয়ার কথা। জমিজমার রেকর্ড অনুযায়ী, এসব জমি যারা কিনেছেন তাদের মধ্যে আছেন মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী সীমা, পুত্র বৈভব, পুত্রবধূ শালিনী যাদব, ভাই নন্দলাল ও নারায়ণ যাদব, নারায়ণের স্ত্রী রেখা, নারায়ণ ও রেখার পুত্র অভয় যাদব ও অন্যরা। এসব কেনাবেচা হয়েছে সরাসরি এবং তাদের তৈরি সংস্থার নামে।

২০৩৫ সালের মধ্যে উজ্জয়িনীর উন্নয়নসংক্রান্ত মাস্টার প্ল্যান কার্যকর হওয়ার কথা। যেসব জমি সস্তায় কেনা হয়েছে সেগুলো ওই পরিকল্পনার অন্তর্গত। হয় হাইওয়ের পাশে, নয়তো বাণিজ্যিক কেন্দ্র লাগোয়া, কিংবা বিভিন্ন অবকাঠামোর ধারেকাছে। কৃষিজমির পরিবর্তন ঘটিয়ে নগরায়ণের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাতে এসব জমির দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার কথা।

তবে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শাসক দল বিজেপি ও রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যদিও প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়নি। 

তবে সরকারের কোনো কোনো ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের অনেকেই আগে থেকেই জমিবাড়ির ব্যবসার সঙ্গে (রিয়েল এস্টেট) যুক্ত। সুতরাং, মোহন যাদব মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর পরিবারের সবাই জমিবাড়ি কেনাবেচা থেকে উপকৃত হয়েছেন এমন মনে করার কারণ নেই। তাছাড়া নিকটাত্মীয়ের বাইরের পারিবারিক সদস্যদের কেনাবেচার জন্য মুখ্যমন্ত্রী দায়ী হতে পারেন না।

আজ দুপুর পর্যন্ত বিজেপির পক্ষ থেকেও এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উজ্জয়িনী মধ্যপ্রদেশের অতি প্রাচীন ও পবিত্র ধর্মীয় শহর। শিপ্রা নদীর তীরবর্তী এই প্রাচীন নগরেই রয়েছে মহাকালেশ্বর মন্দির, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি মাহাত্ম্যপূর্ণ। দেশের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের একটি রয়েছে এখানে। মহাকালেশ্বর মন্দিরের জ্যোতির্লিঙ্গ দক্ষিণমুখী শিবলিঙ্গ। রাজ্যের যেকোনো ব্যক্তি, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতারা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে–পরে কিংবা সরকার গঠনের সময় মহাকালেশ্বর মন্দিরে পূজা দেন। এই মন্দির ছাড়াও উজ্জয়িনীর বৈশিষ্ট্য হলো, দেশের যে চার স্থানে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়, তার একটি এখানে, শিপ্রা নদীর তীরে। বাকি তিন স্থান হলো নাসিক, হরিদ্বার ও প্রয়াগরাজ (এলাহাবাদ)। বিজেপি সরকার উজ্জয়িনীর সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছিল যাতে এই ধর্মস্থানকে কেন্দ্র করে পর্যটনের বিকাশ ঘটে।

স্মার্ট সিটির অন্তর্গত হওয়ার কারণে জমি ব্যবসায়ীদের কাছে উজ্জয়িনীর কদর শুরু থেকেই ছিল। সেই কদর বেড়ে যায় ২০২৩ সালে মাস্টার প্ল্যান তৈরির পর। মোহন যাদব মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে ২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ছিলেন উজ্জয়িনী উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান। তারপর তিনি দায়িত্ব পান মধ্যপ্রদেশ পর্যটন উন্নয়ন পর্ষদের। উজ্জয়িনীর বিধায়ক হিসেবে এলাকার কোন কোন স্থানে কীরকম উন্নয়ন হবে তা ছিল তার জানা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা সেই সুবিধার সদ্ব্যবহার করেছেন। তবে কুম্ভমেলায় স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের জন্য যখন কৃষিজমি দখলের পরিকল্পনা করা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর পরিবার ও তাদের সংস্থা সে সময় ৯২ একর জমির ৬২টি প্লট অধিগ্রহণ করে বলে অভিযোগ উঠে।

এদিকে অনুসন্ধানের সময় সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে একাধিকবার মুখ্যমন্ত্রীর অভিমত জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচন ২০২৮ সালে। পরের বছরে লোকসভার ভোট। এই প্রতিবেদন মধ্যপ্রদেশ বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে। ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর বদল ঘটানো বিজেপির চিরায়ত রীতি। এই প্রতিবেদন সেই সম্ভাব্য বদল ত্বরান্বিত করতে পারে কি? প্রশ্নটা রাজ্যস্তরে বিবেচিত হচ্ছে।