বেইজিংয়ে তারেক রহমান-লি কিয়াং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আজ, সই হতে পারে ১৫-১৭টি চুক্তি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল বুধবার চীনের রাজধানী বেইজিং পৌঁছেছেন। আজ বৃহস্পতিবার চীনের গ্রেট হলে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়াা বিষয়ে তারা আলোচনা করবেন। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হতে পারে।

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা

গতকাল চীনের বন্দরনগরী দালিয়ান থেকে বেইজিংয়ে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিংয়ের চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছান তিনি। চীনের ‘জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস’ (জিএসিসি)-এর মন্ত্রী এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কমিটির সেক্রেটারি সুন মেইজুন রেলওয়ে স্টেশনে তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় শিশু-কিশোররা প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণীর হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি চাউমিং রেলওয়ে স্টেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। রেল স্টেশন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে চীনের দিয়াওইউতাই গেস্ট হাউসে (রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন) নিয়ে যাওয়া হয়। বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিণীসহ সফরসঙ্গীরা এই গেস্ট হাউসেই থাকবেন। এর আগে স্থানীয় সময় বেলা ১টা ৫৮ মিনিটে দালিয়ান উত্তর রেলওয়ে স্টেশন থেকে হাই স্পিড ট্রেনযোগে (বুলেট ট্রেন) বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তারেক রহমান-লি কিয়াং বৈঠক আজ

বেইজিংয়ে আজ বিকালে চীনের গ্রেট হলে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব বিষয় এবং ভবিষ্যতে সম্পর্ক কীভাবে আরো এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে তারা আলোচনা করবেন। বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি, মুক্তবাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি), ব্রিকস এবং অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হবে। এছাড়া, চীনের অর্থায়ন ও সহায়তায় বাংলাদেশে যেসব বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প চালু রয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে। তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইতে পারে ঢাকা। জানা যায়, বৈঠকে চীন থেকে জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। বৈঠকের পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি সই হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন।

এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী ও চীনের এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরাম’ নামে একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, অগ্রাধিকার খাত এবং নতুন বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা তুলে ধরা হবে। চীনের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতের প্রতিনিধিসহ শতাধিক বিনিয়োগকারী এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানাবেন বলে জানা যায়।

আগামীকাল শুক্রবার ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাউ লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এদিন বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেখানকার বীর যোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকালে তিনি বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ প্রধানমন্ত্রীর

বেইজিংয়ে রওয়ানা হওয়ার আগে চীনের দালিয়ানে ‘দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে’ স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) আয়োজিত ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোসে’ বার্ষিক সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন গণমাধ্যমকে জানান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যোগদান করেছেন। সম্মেলনে আসা বিশ্বনেতৃবৃন্দের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন।

এই ফোরামে অংশ নেওয়া চীনা বিনিয়োগকারী ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, নীতিগত সুবিধা এবং ভবিষ্যত্ সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ও প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করবেন।

এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ বা বৃহত্ পরিসরে উদ্ভাবন। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। গতকাল চীনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনের সাইডলাইনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজাখস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ লক্ষ্যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপনের বিষয়ে একমত হন। এছাড়া রাজনৈতিক, ব্যাবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত বলে মত দেন তারা। কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কাজাখস্তানে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।