কাপ্তাই লেকে একের পর এক জাগছে ডুবোচর, কমছে পানির স্তর

তীব্র গরম ও দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টির কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাধার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ-এর পানিরস্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে নৌ-যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ হয়ে যোগাযোগ নির্ভর মানুষের বছরের অর্ধেক সময়ই কাটে দুর্ভোগ-দুর্দশায়। বিশেষ করে গ্রীষ্ম বা শুষ্ক মৌসুমে রাঙ্গামাটি জেলা সদরের সঙ্গে পানি পথে ছয়টি উপজেলার হ্রদ নির্ভর মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। কাপ্তাই হ্রদের মাধ্যমে যাতায়াতকারী ছয়টি  উপজেলার সঙ্গে পুরোদমে লঞ্চ যোগাযোগ পুরোদমে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা জানান, অনাবৃষ্টি, খরা, তলদেশ ভরাটসহ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পাওয়ার কারণে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। হ্রদের বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্থানীয়দের চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে ভারী বৃষ্টিপাত না হলে যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বন্ধ হতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে কাপ্তাই হ্রদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে কাচালং, রাইক্ষ্যং ও শলক নদীর ৬৬ কিলোমিটার খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই ওই অংশে খননের কাজ শুরু করা হবে।

জানা যায়, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে মার্চ মাস থেকে হ্রদে পানি কমতে শুরু করে, বর্তমানে হ্রদের পানি নিম্নস্তরে যাওয়ার কারণে কাপ্তাই হ্রদের বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি ও রাঙ্গামাটি সদর সহ বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে অসংখ্যক চর। হ্রদে পানি না থাকায় বর্তমানে স্বাভাবিক নৌ চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, বোটচালক ও এসব এলাকার বাসিন্দারা জানান, জেলার দশটি উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি, লংগদু, জুরাছড়ি, বরকল, বিলাইছড়িসহ অন্তত ৬টি উপজেলার মানুষ এই হ্রদ দিয়ে রাঙ্গামাটি শহরসহ দেশের অন্যান্য স্থানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। কিন্তু হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় এসব উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন, পরিবহন ও যাতায়াত খরচ ও বাজারগুলোতে পণ্য পরিবহনেও বেড়েছে খরচ দ্বিগুণ। মানুষ বোট দিয়ে চলাচল করছে| অনেক জায়গায় দেখা গেছে, মালামাল পরিবহনের সময় বোট আটকে যায়, ছোট বোটে করে পরিবহন করতে হয়। অল্প পানিতে পণ্যবাহী ইঞ্জিন বোট ঠেলে ঠেলে যোগান দিয়ে বেশি পানির অবস্থানে পৌঁছাতে সময় লাগছে তিন থেকে চার ঘণ্টা। ফলে বেশি ভাড়া ও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকার কারণে নৌপথের যাত্রী, বোটচালক ও প্রান্তিক কৃষকদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে কাপ্তাই হ্রদের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর পানি ধারণক্ষমতা ক্রমশ কমছে। ফলে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে একই ধরনের সংকট দেখা দিচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নৌ-যোগাযোগ এবং হ্রদ নির্ভর জনজীবন বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতি সভাপতি মো. মঈন উদ্দিন সেলিম বলেন, প্রায় ছয়টি উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের লঞ্চ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লংগদু ও বরকল উপজেলার সাথে নামে মাত্র লঞ্চ যোগাযোগ চালু থাকলেও যেকোনো মুহূর্তে তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই লঞ্চ নিয়ে বড়ই বিপদে আছি। প্রতি বছর এই মৌসুমে হ্রদে পানি কমে গিয়ে ডুবন্ত চর জেগে উঠলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এখন হ্রদের বিভিন্ন অংশে ডুবোচর জেগে উঠেছে। ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটির বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি পথগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ১৯৬০ সনে সৃষ্ট বাংলাদেশের একমাত্র কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ প্রয়োজনীয়  ড্রেজিং, খনন ও সংস্কারের অভাবে ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে হ্রদটি এক সময় পার্বত্য মানুষের জন্য অভিশাপ হলেও এদেশের সোনালী দিগন্তের সূচনা করেছিল। মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মৎস্য উৎপাদন, পর্যটন, জলপথ, যাতায়াত ও বনজ সম্পদ আহরণের জন্য কাপ্তাই বাঁধটি নির্মাণ করা হলেও গত ৬৫ বছরেও একবারের জন্য এর সংস্কার ড্রেজিং বা খননের কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় এটি এখন ভরাট হয়ে যাওয়ার পথে।

বরকল উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী আবু বক্কর বলেন,

রাঙ্গামাটি থেকে বরকল উপজেলার কিছু অংশে লঞ্চ চলাচল রয়েছে। বরকলের বৃহত্তম বড়হরিনা ও ছোট হরিনা বাজারের সাথে লঞ্চ চলাচল পুরোদমে বন্ধ থাকায় শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে সমস্যা। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও বাঘাইছড়ির কাচালং ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেবপ্রসাদ দেওয়ান বলেন, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাঘাইছড়ি উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের যাতায়াত ব্যবস্থা দীর্ঘ বছরের। চরম দুর্ভোগ হতে যাত্রীরা রক্ষা পেতে মারিশ্যা থেকে লংগদু ভায়া নানিয়ারচর পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়ক দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন বাঘাইছড়িবাসী। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ছয় মাস কাপ্তাই হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়, তাই লঞ্চ চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়ে যাত্রীদের খাগড়াছড়ি হয়ে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে যেতে হয়। দুর্ভোগের শেষ নেই বাঘাইছড়িবাসীর। বর্তমানে লঞ্চ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

লংগদু প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আলমগীর হোসেন জানান, জেলা সদর থেকে লংগদু আসতে প্রায় তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগে লঞ্চে। অপরদিকে, শিশু ও গর্ববতী মা বোনদের যে হারে কষ্ট হচ্ছে তা না দেখে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। প্রতি বছর এই সময়ে এ লংগদুসহ আশে পাশের অন্যান্য উপজেলার মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। অনেক সময় দেখা যায় হ্রদে জেগে উঠা ডুবোচরে আটকে থাকে লঞ্চ।

রাঙ্গামাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তনয় কুমার ত্রিপুরা জানিয়েছেন, কাপ্তাই হ্রদের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ৪৭ কিলোমিটার কাচালং নদী, ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাইক্ষ্যং নদী ও ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার শলক নদী খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার নির্বাচন করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই ওই নদী খননের কাজ শুরু করা হবে।

তিনি জানান, এসব নদী ড্রেজিং বাবদ ২৫০ কোটি টাকাসহ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার দশটি উপজেলার বিভিন্নস্থানে নদী ভাঙন রোধে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ৬৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসব কাজ শুরু হলে আগামী বছর থেকে এর সুফল পাওয়া যাবে।

রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান বলেন, কাপ্তাই হ্রদ হচ্ছে দেশের অন্যতম একটি মৎস্য ভাণ্ডার। এই হ্রদের সঙ্গে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা এবং রাঙ্গামাটি জেলার ৬টি উপজেলার জনসাধারণের সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা জড়িত। তবে যেভাবে পলি পড়ে হ্রদের গভীরতা কমে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে তাতে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাবে। খুব শীঘ্রই কাপ্তাই হ্রদের ড্রেজিং কাজ শুরু হবে। এছাড়া রাঙ্গামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নদী ভাঙনের ফলে যেসব এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানে বাঁধ ও রিটার্নিং ওয়ালও নির্মাণ করা হবে।