পবিত্র আশুরা আজ

‘...ফিরে এলো আজ সেই মোহরম মাহিনা, ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না...!’ আজ শুক্রবার মহরমের ১০ তারিখ, পবিত্র আশুরা। ইসলামের ইতিহাসে আশুরা এক অসামান্য বরকত-মাহাত্ম্য-তাৎপর্যে উদ্ভাসিত অনন্য দিন। ইবাদত-বন্দেগির জন্যও এ দিবস অতুলনীয়। সবকিছু ছাপিয়ে কারবালার মর্মন্তুদ সকরুণ শোকগাথা এ দিবসকে গভীর কালো রেখামালায় উৎকীর্ণ করে রেখেছে।

৬১ হিজরি সালের এই দিন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের সদস্যরা ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে ফোরাত নদীর পাড়ে কারবালার প্রান্তরে শাহাদত বরণ করেন। পবিত্র আশুরা তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য এক তাৎপর্যময় ও মর্মস্পর্শী বিয়োগাত্মক-শোকাবহ বিষাদময় দিন। এই ঐতিহাসিক দিনটি মুসলমানদের কাছে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠারও দিন।

এ দিনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে অতি প্রিয়। তাই তিনি এ দিন রোজা পালনকারীদের বহুগুণ সওয়াব প্রদান করে থাকেন। হাদিসে মহরমকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর মাস’ বলা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে মহরম মাস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে । যেমন এ মাসে বিয়েশাদি না করা, নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ না করা, মাংস না খাওয়া ও নিরামিষ আহার করা, নতুন কাপড় ও সুন্দর পোশাক পরিধান না করা, সব ধরনের আনন্দ-উৎসব পরিহার করা—এসবই কুসংস্কার। আশুরার দিন বিশেষ করে মিষ্টি, খিচুড়ি বা হালুয়া রান্না করা এবং তা খাওয়া বা বিতরণ করাকে অনেকে জরুরি বা সওয়াবের কাজ মনে করেন, যা সম্পূর্ণ মনগড়া। আশুরার দিন চোখে সুরমা লাগালে চোখ ভালো থাকে বা সওয়াব হয়—এমন কোনো প্রমাণ নেই। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণে অনেকে নিজেদের শরীরে আঘাত করে বা রক্তপাত ঘটিয়ে শোক প্রকাশ করেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আশুরার দিনের একমাত্র সহিহ আমল হলো রোজা রাখা।

পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী তাদের বাণীতে পবিত্র আশুরার মহান শিক্ষা ধারণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে। এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি টিভি চ্যানেলসমূহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে। সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে আজ সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদপত্র অফিসসমূহে ছুটি থাকবে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ইসলামি ফাউন্ডেশন আলোচনার আয়োজন করেছে।

বের হবে তাজিয়া মিছিল
আজ সকাল ১০টায় প্রতি বছরের মতো এবারও আশুরার তাজিয়া মিছিল বের করা হবে। হোসেনী দালান থেকে মিছিলটি লালবাগ আজিমপুর হয়ে ঝিগাতলায় গিয়ে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিকতা। মাগরিবের নামাজের পর থেকে খুতবা পাঠ ও আশুরার তাৎপর্য নিয়ে বয়ান করা হচ্ছে। দিনব্যাপী দোয়া মোনাজাত ছাড়াও মহানবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) গিলাফে (প্রতীকী) সম্মান প্রদর্শন করেন ভক্ত-অনুরাগীরা।

তাজিয়া মিছিলে চাকু-তরবারি বহন ও আতশবাজি নিষিদ্ধ
পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে রাজধানীতে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন শোক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখতে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। দিবসটি উপলক্ষ্যে মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি না হওয়া, কোনো প্রকার ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা, ব্যাগ, পোটলা বা সুটকেস নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ না করা, আগত ব্যক্তিদের ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা, কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট বা বক্সসহ প্রবেশে বাধা প্রদান করা, উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা পিএ সিস্টেম ব্যবহার না করা, কোনো প্রকার ঢাক-ঢোল না বাজানো, আতশবাজি ও যে কোনো ধরনের পটকা ব্যবহার থেকে বিরত থাকাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ।