দুই পা নেই, তবুও উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে অটল জান্নাতুল

জন্ম থেকেই দুটি পা নেই। হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে পারেন না। দুই হাতের ওপর ভর করেই জীবনের প্রতিটি পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ১৯ বছর বয়সী জান্নাতুল ফেরদৌসী।

জানা গেছে, উপজেলার পূর্ণিমাগাঁতী ইউনিয়নের ভেংরি গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান জান্নাতুল। তার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন রাজমিস্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জান্নাতুল ভেংরি দাখিল মাদ্রাসা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানবিক বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। তবে দারিদ্র্যই এখন তার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা।

প্রতিদিন কলেজে যেতে তাকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। যাতায়াতে প্রতিদিন প্রায় ১২০ টাকা খরচ হয়। দিনমজুর বাবার পক্ষে নিয়মিত এই ব্যয় বহন করা সম্ভব না হওয়ায় জান্নাতুল মাসে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় দিন কলেজে যেতে পারেন। বাকি সময় বাড়িতে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যান।

জান্নাতুল বলেন, ‘আমি দুই হাতের ওপর ভর করে চলাফেরা করি। নিয়মিত কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। বাবার পক্ষে প্রতিদিন যাতায়াতের খরচ দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই অনেক ক্লাস করতে পারি না। যদি বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা পেতাম, তাহলে নিয়মিত কলেজে যেতে পারতাম। আমি শুধু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।’

মেয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মা সাহারা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মেয়ের কষ্ট সহ্য করতে পারি না। অর্থের অভাবে ওর জন্য কিছুই করতে পারছি না। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে! সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ পাশে দাঁড়ালে আমার মেয়েটা তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।’

বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমি দিনমজুর মানুষ। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। মেয়েটা খুব মেধাবী। ওর স্বপ্ন অনেক বড়, কিন্তু অভাবের কাছে আমি অসহায়।’

হামিদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জান্নাতুল অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী একজন শিক্ষার্থী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার শেখার আগ্রহ কমাতে পারেনি। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে তার শিক্ষাজীবন আরও সহজ হবে।’

দ্য বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও পরিবেশকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘এটি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়। সবাই মিলে পাশে দাঁড়ালে জান্নাতুলের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আলোকিত হবে।’

বর্তমানে জান্নাতুলের চলাচল সহজ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি তিন চাকার স্কুটি প্রয়োজন। এমন সহায়তা পেলে তার নিয়মিত কলেজে যাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের পথ অনেকটাই সহজ হবে।