৪৫ মাস পর রিজার্ভ আবার ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ টানা ৪৫ মাস পর আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতার ফলে সোমবার (২৯ জুন) দিন শেষে দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২৯ জুন) দিন শেষে দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ৪৫ মাস পর দেশের রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করল। এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৩৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) **ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬)** পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

চলতি মাসের শুরুতে, ১ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক মাসে মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

তবে মোট রিজার্ভের পুরো অর্থ ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় এবং অন্যান্য আর্থিক বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে নিট বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ থাকে, সেটিই অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতার নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের একটি পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করে। এতে আইএমএফের বিশেষ ড্রইং অধিকার (এসডিআর), ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) নিষ্পত্তির জন্য সংরক্ষিত অর্থসহ কয়েকটি খাত বাদ দেওয়া হয়। যদিও এ হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিলে এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতাকে নিরাপদ রিজার্ভ হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থপাচার, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১২০ টাকায় পৌঁছায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে সময় আমদানির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করা হয়। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এরপর ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা ফেরার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরে এসেছে।