তিস্তার পানিতে প্লাবিত উত্তরের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল

উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিপাতে উত্তরাঞ্চলের নদনদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিস্তা ও দুধকুমার নদসহ বিভিন্ন নদীর পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি কিংবা তা অতিক্রম করে প্রবাহিত হওয়ায় রংপুর ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরাঞ্চলে পানি ঢুকে হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, শুরু হয়েছে নদীভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসন স্বল্পমেয়াদি বন্যার সতর্কতা দিয়ে প্রস্তুতি জোরদার করেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, ভারী বৃষ্টি ও ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার প্রভাবে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির চাপ নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। এতে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলের অন্তত ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। ডালিয়া পয়েন্টে সোমবার বিকাল ৪টায় তিস্তার পানি বিপত্সীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচে এবং কাউনিয়া পয়েন্টে ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও আগামী কয়েক দিন পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধিতে হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী, গঙ্গাচড়া, কাউনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বাদাম, ধানের বীজতলা ও সবজিখেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে গঙ্গাচড়ায় তিস্তার পানি বেড়ে উপজেলার সাত ইউনিয়নের প্রায় ১৫টি চর প্লাবিত হয়েছে। শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। লক্ষ্মীটারী, কোলকোন্দ, নোহালী ও মর্ণেয়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাট ও ধানখেতের ক্ষতির পাশাপাশি তিস্তা সেতু প্রতিরক্ষা বাঁধ ও কয়েকটি এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, রান্না ও দৈনন্দিন জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বেড়ে গত ১৮ ঘণ্টায় ২৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে সোমবার বিকাল ৩টায় পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে লোকালয় প্লাবিত হতে শুরু করেছে। দক্ষিণ তিলাই গুচ্ছগ্রাম ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শুকনো খাবার ও মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী এলাকায় সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।

নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উজানের ঢল ও বৃষ্টিতে দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গাধর, শংকোষ ও ফুলকুমার নদীর পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র বিপত্সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। রোপা আমনের বীজতলা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, গত ৩০ ঘণ্টায় দুধকুমারের পানি ৯৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপরে উঠে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী তিন দিন তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানির সমতল আরো বাড়তে পারে এবং নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জেলা প্রশাসন সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন রেখেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরও রংপুরসহ উজানে আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে।