বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; বরং একটি সময়ের, একটি নন্দনতত্ত্বের এবং একটি আলোকিত চেতনার অবসানের বেদনাময় ঘোষণা। সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের অগ্রপথিক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং সংস্কৃতিসেবী মুস্তাফা মনোয়ার সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সৌন্দর্যবোধ, মানবিকতা ও সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত করেছেন। তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছিলেন, যখন শিল্পচর্চা ছিল কেবল ব্যক্তিগত অনুরাগের বিষয় নয়, বরং জাতিসত্তার নির্মাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষালাভের মধ্য দিয়ে তিনি যে শিল্পযাত্রা শুরু করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে বিস্তৃত হয়েছে চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, পাপেট শিল্প এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের বহুমাত্রিক পরিসরে। তাঁর শিল্পচর্চা কখনো ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মানুষের মনোজগৎ নির্মাণের এক নিরন্তর অভিযাত্রায় পরিণত হয়েছিল।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে আধুনিক ও জনপ্রিয় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বুঝেছিলেন, শিশুদের কল্পনাশক্তি বিকাশে এবং নৈতিক শিক্ষা প্রদানে পাপেট একটি অসাধারণ মাধ্যম। তাঁর নির্মিত ও পরিকল্পিত পাপেট অনুষ্ঠানগুলো কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিল না; বরং সেগুলো ছিল মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, নান্দনিকতা ও শিক্ষার সৃজনশীল পাঠশালা। আজও বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ শৈশবের স্মৃতিতে তাঁর পাপেট চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের আবিষ্কার করেন। সেই স্মৃতিগুলোই প্রমাণ করে, একজন শিল্পী কেবল শিল্প নির্মাণ করেন না; তিনি মানুষের অনুভূতির ভুবনও নির্মাণ করেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল সৃজনশীলতার এক অনন্য অধ্যায়। অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, শিশুদের জন্য মানসম্মত বিনোদন এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রসারে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা আজও অনুসরণীয়। এমন এক সময়ে, যখন গণমাধ্যমে বাণিজ্যিকতার চাপ ক্রমশ বেড়ে চলেছে, তখন মোস্তফা মনোয়ার বিশ্বাস করতেন—গণমাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে মানুষকে সুন্দর ও সৃজনশীল জীবনের দিকে আহ্বান জানানো। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগে সেই দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটেছে।
চিত্রশিল্পী হিসেবেও তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র। তাঁর শিল্পকর্মে প্রকৃতি, মানুষ, লোকজ ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের রঙিন জীবনবোধ এক অনন্য নন্দনতাত্ত্বিক ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি কখনো কেবল রঙের ব্যবহার শেখাননি; বরং শিখিয়েছেন রঙের ভেতর দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতে। তাঁর শিল্পে যেমন ছিল মাটির গন্ধ, তেমনি ছিল আধুনিকতার পরিশীলিত বোধ। এ কারণেই তিনি একই সঙ্গে ছিলেন শেকড়নিষ্ঠ এবং বিশ্বমানের শিল্পী।
মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত শিল্পী কখনো কেবল নিজের সাফল্যের জন্য কাজ করেন না; তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ নির্মাণ করেন। তিনি ছিলেন শিক্ষক, সংগঠক, সংস্কৃতির অভিভাবক এবং এক নিবেদিতপ্রাণ আলোকবর্তিকা। অসংখ্য তরুণ শিল্পী তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, সাহস পেয়েছেন এবং শিল্পচর্চার সঠিক দিকনির্দেশনা লাভ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে অহংকারের পরিবর্তে ছিল বিনয়, প্রচারের পরিবর্তে ছিল নিষ্ঠা এবং প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ছিল সহযোগিতার মনোভাব।
আজকের বাংলাদেশে যখন সাংস্কৃতিক চর্চা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি, তখন মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন ও কর্ম আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নয়; বরং তার সাংস্কৃতিক পরিশীলনেও নিহিত। সংস্কৃতিবান মানুষই সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারে এই বিশ্বাস তিনি আজীবন ধারণ করেছেন। তাই তাঁর জীবন আমাদের কাছে কেবল স্মৃতির বিষয় নয়; এটি একটি দিকনির্দেশনা।
তাঁর প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী হলেও সৃজনশীলতা অমর। একজন শিল্পী শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও তাঁর সৃষ্টি, তাঁর দর্শন এবং তাঁর মানবিক আদর্শ
যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়। মুস্তাফা মনোয়ারও সেই অমর শিল্পীদের কাতারে স্থান করে নিয়েছেন, যাঁদের নাম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়েছে শিল্প মানে কেবল নান্দনিকতার চর্চা নয়; শিল্প মানে মানুষকে আলোকিত করা, সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা এবং আগামী প্রজন্মের হাতে একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন তুলে দেওয়া।
মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আঁকা রঙ, তাঁর নির্মিত পাপেট, তাঁর সৃষ্ট শিশুতোষ আনন্দভুবন এবং তাঁর সারা জীবনের সাংস্কৃতিক সাধনা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরজাগরুক থাকবে। এমন মানুষরা মৃত্যুর মধ্য দিয়েও শেষ হয়ে যান না; তাঁরা রয়ে যান জাতির স্মৃতিতে, শিল্পের ইতিহাসে এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি সৃজনশীল স্বপ্নে। শ্রদ্ধাঞ্জলি, মুস্তাফা মনোয়ার। আপনার আলোর উত্তরাধিকার বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে দীর্ঘদিন পথ দেখাবে।
লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ