হলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর

জঙ্গি সন্দেহে নির্যাতন পরে মৃত্যু: সুষ্ঠু বিচার চায় শাওনের পরিবার

২০১৬ সালের ১ জুলাই। ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশিসহ ২০ জন নিহত হন। পরদিন সেনাবাহিনীর পরিচালিত অপারেশন থান্ডারবোল্টে ছয় হামলাকারী নিহত হয়। সেই বিভীষিকার মধ্যেই আরেকটি পরিবারের জীবনে নেমে আসে দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডির। হামলার ১০ বছর পরও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের দক্ষিণ কদমতলীর হৃদয়মনি ক্রিয়েটিভ স্কুল এলাকার একটি ছোট্ট ঘরে বসবাসকারী জাকির হোসেন শাওনের পরিবার বিচারের অপেক্ষায় ।

শাওনের মা মাকসুদা বেগম এখনো ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে কাঁদেন। তার কণ্ঠে আজও একই প্রশ্ন 'আমার ছেলে যদি জঙ্গি না-ই হয়ে থাকে, তাহলে কেন তাকে লাশ হয়ে ফিরতে হলো?'

পরিবার ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জাকির হোসেন শাওন (১৯) হলি আর্টিজানের প্রধান বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। হামলার রাতে জঙ্গিরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে হত্যাযজ্ঞ চালালে শাওন প্রাণ বাঁচাতে পেছনের দিক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরিবারের দাবি, জঙ্গিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি কাঁটাতারের বেড়া টপকে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেছিল র‍্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসা শাওনকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করা হয়।

শাওনের মা মাকসুদা বেগমের অভিযোগ, আটকের পর ছেলেকে কয়েক দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানবিক নির্যাতন করা হয় । তিনি বলেন, 'আমি তিন দিন ছেলেকে খুঁজে পাইনি । পরে সাংবাদিকদের তথ্যে ঢাকা মেডিক্যালে গিয়ে দেখি ও হাসপাতালে। যখনই একটু জ্ঞান ফিরত, শুধু বলত, 'স্যার, আর মাইরেন না । আমি আর সহ্য করতে পারছি না।' তারপর আবার অজ্ঞান হয়ে যেত।' তিনি দাবি করেন, শাওনের শরীর জুড়ে আঘাতের চিহ্ন ও জমাট রক্ত ছিল।

পরিবারের অভিযোগ, ১ জুলাই আটক হওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকার পর ৮ জুলাই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শাওনের মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। তবে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, শাওন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগই পাওয়া যায়নি।

হামলার পরপরই শাওন ও তার প্রধান বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম চৌকিদারকে জঙ্গিদের সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করা হয় । কিন্তু দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট আদালতে যে অভিযোগপত্র দাখিল করে, সেখানে শাওনের বিরুদ্ধে কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিটিটিসি জানায়, হামলায় অভিযুক্ত ২১ জনের তালিকায় শাওনের নাম নেই। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি ছিলেন একজন নিরীহ কর্মচারী, জঙ্গি নন ।

সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলীর ছোট্ট ঘরে বসে চোখের জল মুছতে মুছতে মাকসুদা বেগম বলেন, 'আমার ছেলে জঙ্গি ছিল না। জঙ্গিদের হাতেও মারা যায়নি। আমার নিরীহ ছেলেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বুক খালি হয়ে গেল । ১০ বছর হয়ে গেল, প্রশাসনের কেউ একটা সান্ত্বনার কথাও বলেনি। আমরা গরিব বলেই কি আমাদের বিচার পাওয়ার অধিকার নেই?'

২০১৭ সালে সরকার হলি আর্টিজান হামলায় নিহত দেশি- বিদেশি ২০ জনের পরিবারকে মোট ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। প্রত্যেক পরিবার পায় ১৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা করে । কিন্তু শাওন এবং সাইফুল ইসলামের পরিবার সেই ক্ষতিপূরণের তালিকায় স্থান পায়নি, যদিও পরবর্তী তদন্তেই নিশ্চিত হয় যে তারা হামলাকারী ছিলেন না; বরং হামলার শিকার নিরপরাধ কর্মচারী।