আফ্রিকা মহাদেশের গোল্ড কোস্টখ্যাত দেশ ঘানা। দেশটির সাভানা অঞ্চলের লারাবাঙ্গা নামক এক মুসলিমপ্রধান গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’। এটি শুধু ঘানার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদই নয় বরং পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন ইসলামি স্থাপত্য হিসেবেও পরিচিত। ধর্মীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে স্থানীয়দের কাছে এটি ‘পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ নামে সুপরিচিত।
লোকগাথায় মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস
লারাবাঙ্গা মসজিদকে ঘিরে নানা লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে। একটি জনপ্রিয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ১৪২১ সালে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দেওয়া মুসলিম ব্যবসায়ী আইয়ুবা এক রাতে এ অঞ্চলে একটি রহস্যময় পাথরের পাশে অবস্থান করেন। রাতে স্বপ্নে তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ পান। পরদিন ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান, অলৌকিকভাবে মসজিদের ভিত্তি তৈরি হয়ে গেছে। পরে সেই ভিত্তির ওপরই তিনি মসজিদটি নির্মাণ করেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, আইয়ুবার মৃত্যুর পর মসজিদের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। দাফনের তিন দিন পর তার কবরের ওপর একটি বাওবাব গাছ জন্ম নেয়, যা এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামের মানুষ এই গাছের পাতা ও কাণ্ডের নানা ঔষধি গুণ রয়েছে বলে মনে করেন।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে আরেকটি লোকগাথাও প্রচলিত আছে। অসেকে মনে করেন ১৬০০ শতকের শেষ দিকে ব্রাইমাহ নামে এক ব্যক্তি যুদ্ধ শেষে একটি বল্লম নিক্ষেপ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন বল্লমটি যেখানে গিয়ে পড়বে, সেখানে তিনি বসতি স্থাপন করবেন। বল্লমটি একটি উজ্জ্বল উঁচু স্থানে গিয়ে পড়ে। সেখানেই তিনি তার ঘর এবং এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি এই জায়গার নাম দেন ‘লারাবাঙ্গা’, যার অর্থ ‘আরবদের ভূমি’।
জান্নাত থেকে আসা কোরআন
মসজিদটির অন্যতম আকর্ষণ এর ভেতরে সংরক্ষিত একটি প্রাচীন পবিত্র কোরআন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ইমাম ইদান বারিমাহ ব্রামাহ অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে মোনাজাত করার পর এই কোরআন শরিফ জান্নাত থেকে উপহারস্বরূপ তার কাছে পাঠানো হয়েছিল। এ কারণে কোরআনটি এলাকাবাসীর কাছে বিশেষভাবে পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।
সুদানি-সাহেলিয়ান স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
শহুরে অঞ্চলের আধুনিক মসজিদের তুলনায় লারাবাঙ্গা মসজিদ আকারে ছোট। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৮ মিটার। কাদা, মাটি ও খড় দিয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি মূলত পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সুদানি-সাহেলিয়ান স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম উৎকৃষ্ট উদাহরণ এবং মালির বিখ্যাত জেনের গ্র্যান্ড মসজিদের স্থাপত্যধারার সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
মসজিদটিতে দুটি পিরামিড আকৃতির মিনার রয়েছে। এর একটি মিহরাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্যটি মিনার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের দেয়ালে মজবুত কাঠের বিম ও টেকো ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো স্থাপনাটিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাদা রঙে আবৃত এই মসজিদ আজও ঘানার ইসলামি ঐতিহ্য ও স্থাপত্য ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে।