ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা থাকল জয়ী দলের নাম আর্জেন্টিনা, আর পরাজিত দল কেপ ভার্দে। কিন্তু স্কোরলাইনে কেউ এগিয়ে থাকলেই কি পুরো ম্যাচ জেতা হয়ে যায়, আর পিছিয়ে থাকলেই কি হার? আটলান্টিক মহাসাগরের বুক থেকে উঠে আসা আফ্রিকার পুঁচকে এক দেশ আজ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের যেভাবে টানা ১২০ মিনিট নাকানি চুবানি খাইয়ে গেল, তাতে কে বলবে এটি তাদের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার ফুটবলার ও বেঞ্চের উদযাপন দেখেই চমকে যেতেন পারেন যে কেউ। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আসা একটা পরাশক্তি দল মাত্র ‘রাউন্ড অব ৩২’ বা শেষ বত্রিশের একটা ম্যাচ জিতেই যেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ করল! হবেই নাও বা কেন? ম্যাচের ১১১তম মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডটি যদি ডিফেন্ডার বোর্জেসের হাতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে না জড়াত, তবে হয়তো ম্যাচের শেষ দৃশ্যটাই বদলে যেতে পারত। ৩–২ গোলের এই স্বস্তির জয় না এলে হয়তো শেষ ষোলোতে ওঠাই হতো না লিওনেল মেসির দলের।
শক্তিমত্তায়, সাফল্যে দুই দলের বিশাল ব্যবধানের কারণে এই ম্যাচকে কেউ কেউ বিশ্বকাপ নকআউটের সবচেয়ে বড় ‘মিস ম্যাচ’ কি না প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে নিজেদের সাহসিকতা দিয়ে এটিকে বানিয়ে তুলল এই বিশ্বকাপের অন্যতম ‘বিগ ম্যাচ’।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য অনুমিত পথেই ছিল। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোলমুখে প্রথম আক্রমণ করার পর পরবর্তী আধা ঘণ্টায় কেপ ভার্দেকে কোনো সুযোগই দেয়নি। উল্টো ২৯তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে কাঙ্ক্ষিত লিড এনে দেন জাদুকর লিওনেল মেসি। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের বাড়ানো লম্বা পাস চমৎকার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, দ্বিতীয় স্পর্শেই কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়ার মাথার ওপর দিয়ে চিপ করে বল জালে জড়ান। চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির সপ্তম এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম গোল। এর মাধ্যমে টানা ৮টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার এক অনন্য ও বিরল কীর্তি গড়লেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
মূলত এই গোল হজম করার পর থেকেই শুরু হয় কেপ ভার্দের রূপকথার প্রতিরোধ পর্ব। প্রথমার্ধের বিরতির ঠিক আগে এনজো ফার্নান্দেজ ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেলেও ভোজিনিয়া দারুণ এক সেভে কেপ ভার্দেকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
বিরতির পর সম্পূর্ণ অন্য এক কেপ ভার্দেকে দেখা যায়, যারা আক্রমণে ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সাহসী। ৫৪ মিনিটে দেরয় দুয়ার্তের এক জোরালো শট আর্জেন্টাইন বাজপাখি এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঠেকিয়ে না দিলে তখনই সমতায় ফিরত তারা। তবে সেই রক্ষা বেশি দীর্ঘ হয়নি; ঠিক ৫ মিনিট পর ৫৯ মিনিটে রায়ান মেন্দেসের নিখুঁত কাটব্যাক থেকে অত্যন্ত দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া শটে আর্জেন্টিনার জাল কাঁপিয়ে দেন সেই দুয়ার্তে (১-১)।
গোল হজম করার পর মাঠের ভেতরে চরম অস্থির হয়ে পড়ে আলবিসেলেস্তেরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোচ লিওনেল স্কালোনি একে একে মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেস এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেসদের। মেসিও একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকেন। কিন্তু ৬২ মিনিটে এবং ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিক কর্নারের বিনিময়ে প্রতিহত করে আর্জেন্টিনার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। শেষ দিকে মেসির আরও একটি ফ্রি-কিক এবং পারেদেসের দূরপাল্লার বুলেট শট ঠেকিয়ে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান এই গোলকিপার।
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হতেই দ্বিতীয় মিনিটে (৯২ মিনিটে) আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের ফ্লিকে বল পেয়ে চমৎকার এক বাঁ পায়ের শটে জাল খুঁজে নেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস।
কিন্তু কেপ ভার্দে যে সহজে হার মানার দল নয়! ১০৩ মিনিটে বাম দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের এক চোখধাঁধানো বাঁকানো শটে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দেন সিডনি কাবরাল। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার এমি মার্তিনেজের স্রেফ চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। চলতি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার এই গোলের পর আবারও স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ যখন নিশ্চিতভাবেই পেনাল্টি টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই ১১১ মিনিটে আসে কেপ ভার্দের জন্য সেই ‘নিষ্ঠুর মুহূর্ত’। মেসির নেওয়া কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর করা হেডটি কেপ ভার্দের বোর্হেসের হাতে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়িয়ে যায়। এই দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলেই শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায় কেপ ভার্দের রূপকথার স্বপ্ন।
তবুও শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি আফ্রিকার এই লড়াকু দলটি। ১১৬ মিনিটে কাবরালের নেওয়া দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক এমি মার্তিনেজ আঙুলের ডগায় ছুঁইয়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করেন। এরপর ১১৯ মিনিটে গিলসন বেঞ্চিমোলের একদম সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরও একটি নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন এমি মার্তিনেজ।
এই শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর আগামী ৭ জুলাই শেষ ১৬-র মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে আফ্রিকার আরেক পরাশক্তি মিসর।