বিশ্বজুড়ে ধনকুবের বা মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও একই সঙ্গে বাড়ছে সম্পদ বৈষম্য। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএসের ১৭তম ‘গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্ট’-এ উঠে এসেছে এমন চিত্র। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সম্পদ সৃষ্টি ও বণ্টনের প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টানা তৃতীয় বছরের মতো বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। এ সময়ে বৈশ্বিক ব্যক্তিগত মোট সম্পদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
ইউবিএস গ্লোবাল ওয়েলথ ম্যানেজমেন্টের সহ-প্রধান ইকবাল খান বলেন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উদীয়মান বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সম্পদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ লাখ নতুন মিলিয়নেয়ার যুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ অন্তত ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিক হয়েছেন। নতুন এই ধনকুবেরদের প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা।
তবে অতি ধনীদের সম্পদ বাড়লেও অধিকাংশ দেশে মধ্যম সম্পদ বা ‘মিডিয়ান ওয়েলথ’ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরতে এই সূচক বেশি কার্যকর।
মধ্যম সম্পদের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়াম। তাদের পরেই রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যেখানে জনপ্রতি মধ্যম সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।
অর্থনীতিবিদ সল এসলেক বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় সম্পদ বণ্টন তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হলেও ধনী ও মধ্যবিত্তের ব্যবধান এখনও স্পষ্ট। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রে গড় পারিবারিক সম্পদ মধ্যম পারিবারিক সম্পদের তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি।
ইউবিএস বলছে, নতুন মিলিয়নেয়ারদের বড় অংশই নগদ অর্থের মালিক নন। তাদের সম্পদের প্রধান অংশ আবাসন বা নিজস্ব বাড়ির মূল্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশে সম্পত্তির দাম বাড়ায় অনেকেই কাগজে-কলমে মিলিয়নেয়ার হয়েছেন। তবে এসব সম্পদ বিক্রি না করা পর্যন্ত তা নগদ অর্থে রূপান্তর করা সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ায় গত পাঁচ বছরে আবাসন বাজারে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও দেশটির আবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডোমেইন’ বাজারে ধীরগতির আভাস দিয়েছে। সুদের হার বৃদ্ধি এবং করনীতির কিছু পরিবর্তনকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সম্পদ বৈষম্য পরিমাপে ‘জিনি কোএফিশিয়েন্ট’ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এই সূচকে শূন্য মানে সম্পদের সমান বণ্টন এবং এক মানে সব সম্পদ একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা।
এ হিসাবে অস্ট্রেলিয়ার জিনি স্কোর ২০২৪ সালের ০ দশমিক ৫৫ থেকে কমে ২০২৫ সালে ০ দশমিক ৫৩ হয়েছে। ফলে ৫৬টি দেশের মধ্যে দেশটির অবস্থান ৫২তম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্পদ বৈষম্য সবচেয়ে কম স্লোভাকিয়ায়। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায়।
ইউবিএসের ভাষ্য, কোনো দেশ একই সঙ্গে অত্যন্ত ধনী এবং উচ্চ বৈষম্যপূর্ণ হতে পারে। আবার তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সেখানে সম্পদের সুষম বণ্টনও থাকতে পারে। তাই সম্পদের পরিমাণের পাশাপাশি এর বণ্টনও অর্থনৈতিক বাস্তবতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।