তীব্র তাপপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে স্বাধীনতা দিবসের (৪ জুলাই) উদযাপনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একাধিক অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ারও কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে বাধ্য হন আয়োজকরা।
শুক্রবার (৩ জুলাই) মেলার আয়োজকরা এক বিবৃতিতে বলেন, দর্শনার্থী, স্বেচ্ছাসেবক, শিল্পী, বিক্রেতা এবং কর্মীদের নিরাপত্তাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে পরে আবার মেলাটি খুলে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া দপ্তর ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, শুক্রবার দেশটির পূর্ব উপকূল ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে ১৬ কোটি ৫০ লাখের বেশি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে ছিলেন। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছে, আর এর প্রভাব পড়েছে ছুটির দিনের নানা আয়োজনে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষ উদযাপনের আয়োজন করেছেন। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচও চলছে। তবে প্রচণ্ড গরমের কারণে স্বাধীনতা দিবস ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে পরিকল্পিত অনেক অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছে।
নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড থেকে শুরু করে কলোরাডো পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আয়োজকেরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ফিলাডেলফিয়ার 'স্যালুট টু ইন্ডিপেন্ডেন্স সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল প্যারেড'। এটি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশটির অন্যতম বড় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। প্যারেডের আয়োজক সংস্থা ওয়াওয়া ওয়েলকাম আমেরিকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ডেলবেনে বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু বিপজ্জনক আবহাওয়ার মধ্যে এত বড় জনসমাগমের অনুষ্ঠান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনে 'ফ্রিডম ২৫০' মেলার আয়োজকেরা জানান, আবহাওয়ার পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসার পর স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় মেলাটি আবার খুলে দেওয়া হয়।
ওয়াশিংটন ডিসির ফায়ার অ্যান্ড ইএমএস বিভাগ জানিয়েছে, শুক্রবার মেলায় তাপজনিত অসুস্থতার কারণে বেশ কয়েকজনকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, অন্তত ১১ জনকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যদিও তাদের সবার অসুস্থতার কারণ যে তাপপ্রবাহ ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বিভাগটি আরও জানিয়েছে, স্বাধীনতা দিবসের ছুটিতে ন্যাশনাল মল এলাকায় বিপুল মানুষের সমাগম হবে। তাই বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের পর্যাপ্ত পানি পান করা, রোদে দীর্ঘ সময় না থাকা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মেলায় উপস্থিত এক দর্শনার্থী জানান, তিনি একজন মধ্যবয়সী নারীকে তাপজনিত অসুস্থতায় কষ্ট পেতে দেখেছেন। মেলার কর্মীরা তার দুই হাত বরফভর্তি পানিতে ডুবিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। তার ভাষায়, এত তীব্র গরমের মধ্যে এ ধরনের বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করা ঠিক হয়নি।
চরম গরমের কারণে ওয়াশিংটন ডিসির আরেকটি বড় অনুষ্ঠান 'অ্যা ক্যাপিটল ফোর্থ' কনসার্টেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। দর্শনার্থীদের প্রবেশের সময় বিকেল ৩টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টায় নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে প্রবল গরমের পূর্বাভাস থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার খোলা আকাশের নিচেই স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার পরিকল্পনা বজায় রেখেছেন। তিনি জানান, অনুষ্ঠানটি বাইরে অনুষ্ঠিত হোক এটাই তিনি চেয়েছিলেন।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহ পুরো ছুটির সময়জুড়েই অব্যাহত থাকবে। চলতি বছরে অনেক এলাকায় কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গ্রীষ্মের শুরুতেই নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। তবে উত্তর আমেরিকায় এবারের দাবদাহের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর বিস্তৃতি। মধ্যাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তাপপ্রবাহ সপ্তাহান্তজুড়ে আরও বিস্তৃত এলাকাকে প্রভাবিত করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ফিলাডেলফিয়ায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা আরও অনেক বেশি হবে, যা শহর দুটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সিটির তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ২০১২ সালের পর শহরটির সবচেয়ে উষ্ণ দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুক্রবারও সেখানে অনুভূত তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন এবং সবাইকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, শনিবার মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা কিছুটা কমতে পারে। তবে পূর্বাঞ্চলে তীব্র গরম অব্যাহত থাকবে, যা বাইরে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের সমভূমি, মিডওয়েস্ট এবং গ্রেট লেকস অঞ্চলে শক্তিশালী বজ্রঝড়ের আশঙ্কাও রয়েছে। এসব ঝড়ের সঙ্গে বড় আকারের শিলাবৃষ্টি, দমকা বাতাস, আকস্মিক বন্যা এবং কয়েকটি এলাকায় টর্নেডোও হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
রোববার থেকে ভার্জিনিয়া, ক্যারোলাইনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল এবং কানাডার কিছু এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র হয়ে উঠছে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
সূত্র : বিবিসি