মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় মঙ্গলবার আয়োজিত ‘ন্যাটো সামিট ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’-এ এই বিশাল উদ্যোগের ঘোষণা দেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে। মূলত ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের দাবি—ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের ব্যয় বাড়ানোর আহ্বানে সাড়া দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আঙ্কারার প্রতিরক্ষাশিল্প ফোরামে উৎসবমুখর পরিবেশে মার্ক রুতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন এই বহুজাতিক ক্রয় জোটের ঘোষণা দেন। বড় পর্দায় প্রদর্শন করা বিভিন্ন চুক্তির আর্থিক মূল্যের এই ঘোষণা ছিল সম্মেলনের বড় চমক। নতুন এই চুক্তির অধীনে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন কোম্পানি নর্থরপ গ্রুম্যানের কাছ থেকে উন্নত নজরদারি ড্রোন এবং সুইডিশ কোম্পানি ‘সাব’-এর কাছ থেকে অত্যাধুনিক উড়োজাহাজ কিনবে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন-বিধ্বংসী সক্ষমতা বাড়াতে মিত্র দেশগুলো ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে।
ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত হ্রাস পাওয়ায় ইউরোপে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের বিষয়েও জার্মানি ও অন্যান্য দেশের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্ক রুতে জানান, রুশ হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্পের জোরালো চাপের মুখে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি করেছে। ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্র ও কানাডা তাদের প্রতিরক্ষা খাতে আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বা ৯ হাজার কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে, যার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার কোটি ডলারে।
এই সম্মেলনের এক বিশেষ দিক হলো তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক। শোনা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার কারণে তুরস্ককে যে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, ট্রাম্প হয়তো তুরস্ককে সেই কর্মসূচিতে পুনরায় যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন হামলাকে ঘিরে ন্যাটোর অভ্যন্তরে কিছুটা উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সংঘাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না থাকা এবং পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এছাড়া ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও ইউরোপীয় মিত্রদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা ইউক্রেনের জন্য আট হাজার কোটি ডলারের বিশাল সহায়তা প্যাকেজের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। সোমবার কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ভয়াবহ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোর এই বিশাল অস্ত্র চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।