কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় গত তিন দিনে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ১৫ হাজার ৮১৩ জন রোহিঙ্গা। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে প্রকাশিত ‘ইন্টার সেক্টর ফ্ল্যাশ সিচুয়েশন আপডেট-২’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই রাত ৮টা থেকে ৭ জুলাই সকাল ১০টা পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে মোট ১৬০টি দুর্যোগের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩টি ঝড়ো হাওয়া, ৫২টি পাহাড়ধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা, তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়া এবং দুটি অবকাঠামোগত ঝুঁকির ঘটনা ঘটে। নিহত ১০ জনের মধ্যে আটজন পাহাড়ধসে এবং দুজন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এছাড়া বিভিন্ন ঘটনায় আরও ১০ জন আহত হয়েছেন। দুর্যোগের কারণে চরম ঝুঁকিতে থাকা তিন হাজার ১৮২ জন রোহিঙ্গাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ক্যাম্পগুলোর অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত এক হাজার ৬১৪টি বসতঘর আংশিক এবং ১০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে ১০ নম্বর ক্যাম্প। সেখানে এক হাজার ৮৯১ জন দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৬ নম্বর ক্যাম্পে এক হাজার ৩৭৫ জন, ১২ নম্বরে এক হাজার ২৫৫ জন, ৫ নম্বরে এক হাজার ১৪৯ জন এবং ১-ওয়েস্ট ক্যাম্পে এক হাজার ৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশাপাশি ১১ নম্বর (৯৮৮ জন), ৭ নম্বর (৭৩৩ জন), ১৬ নম্বর (৬৮৩ জন), ১৮ নম্বর (৬৭৪ জন) এবং ১৪ নম্বর (৬২৫ জন) ক্যাম্পেও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বসতঘর বা আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষতির হিসাবে ১১ নম্বর ক্যাম্প সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। সেখানে ২১৩টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বাইরে ১২ নম্বর ক্যাম্পে ১৯১টি, ৯ নম্বরে ১১৯টি, ১৬ নম্বরে ৮৮টি, ১০ নম্বরে ৮৭টি এবং ১৮ নম্বর ক্যাম্পে ৮৪টি আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতির শিকার হয়েছে।
সাধারণ অবকাঠামো ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। দুর্যোগে ৩৯১টি বিভিন্ন স্থাপনা, ৪৬৫টি প্রতিরোধক দেয়াল (রিটেইনিং ওয়াল), ১০৪টি চলাচলের পথ, ৭৪টি সিঁড়ি, আটটি সড়ক ও সাতটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ২০টি শিক্ষাকেন্দ্র ও দুটি মসজিদেও আঘাত হেনেছে দুর্যোগ। এতে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও জরুরি সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দুর্যোগে ৬০৯টি শৌচাগার, ১৮৮টি গোসলখানা, ৪২টি নলকূপ, ২৪টি পানির উৎস, ১১টি ট্যাপ স্ট্যান্ড, ৯টি বর্জ্য শোধনাগার (ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ১১টি বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র এবং দুটি পানি সংরক্ষণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ক্যাম্পগুলোতে বিশুদ্ধ পানির সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা এই বৃষ্টির কারণেই ক্যাম্পগুলোতে এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে মানবিক সহায়তায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা।