একদিকে প্রায় নিয়মিত মাদক উদ্ধারের খবর, অন্যদিকে নতুন নতুন এলাকায় মাদক কারবার বিস্তারের অভিযোগ। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে।
ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক উদ্ধারের একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে—আড়াইহাজারে এত মাদক আসছে কোথা থেকে?
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও ব্যতিক্রমী একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে উপজেলার গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়া। স্থানীয়দের সম্মিলিত উদ্যোগে এলাকাটি এখন প্রায় মাদকমুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।
জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে আড়াইহাজারে একাধিক মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত মাসে গোপালদী ইউনিয়নের উলুকান্দি এলাকা থেকে ৫০ কেজি গাঁজা এবং বিশনন্দী ফেরিঘাট এলাকা থেকে ২০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ২৫ জুন উলুকান্দি পশ্চিমপাড়া এলাকা থেকে ১০ পিস ইয়াবাসহ এক যুবক এবং ২ জুলাই পৌরসভার পায়রা চত্বর এলাকা থেকে ২২ পিস ইয়াবাসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়লেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলাজুড়ে ২০০টিরও বেশি মাদক লেনদেনের স্পট রয়েছে। আগে যারা মাদক সেবন করতেন, তাদের অনেকে এখন মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এর ফলে অনেক শিক্ষিত পরিবারের তরুণও মাদকের ছোবলে বিপথে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গোপালদী, বিশনন্দী, চৈতনকান্দা, ব্রাহ্মন্দী, আড়াইহাজার সদর, পাঁচরুখী, পুরিন্দা, জাঙ্গালিয়া, উচিতপুরা ও কালাপাহাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক সক্রিয়। সন্ধ্যার পর নির্জন সড়ক, বাজারের পেছনের অংশ, নদীতীর ও ফসলি জমির আড়ালকে মাদক লেনদেনের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আড়াইহাজার পৌরসভার বাসিন্দা আব্দুল মোমেন বলেন, “আগে এলাকায় চুরি-ডাকাতির ঘটনা নিয়ে বেশি আলোচনা হতো। এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় মাদক। প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই মাদক নিয়ে মানুষের অভিযোগ রয়েছে।”
গোপালদী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহীন মিয়া বলেন, “খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও মূল হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে কিছুদিন পর আবার একই চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।”
স্থানীয় শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাদকের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে বিপথে যাচ্ছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি।”
তবে এই হতাশার মধ্যেও আশার খবর এসেছে গোপালদী পৌরসভার রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়া থেকে। কয়েক মাস আগেও সন্ধ্যার পর এলাকাটিতে মাদকসেবীদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত। অভিভাবকেরা সন্তানদের বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করতেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম জানান, এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে রাতের পাহারা, সামাজিক নজরদারি এবং প্রশাসনের সহযোগিতায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এর ফলে প্রকাশ্যে মাদকসেবন ও কারবার বন্ধ হয়েছে এবং এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে এসেছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই মাদক নির্মূলে স্থায়ী সাফল্য অর্জন সম্ভব। রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়ার অভিজ্ঞতা এখন অন্য এলাকাগুলোর জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, “আড়াইহাজারকে কোনোভাবেই মাদকের নিরাপদ রুট বা আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না। যারা যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় কার্যক্রম ও ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে হবে।”
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সবজেল হোসেন বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। নিয়মিত অভিযান চলছে এবং মাদক কারবারিদের তালিকা করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে পুলিশ একা এ সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং মাদকের উৎস শনাক্ত করে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়ার মতো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে আড়াইহাজারকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব হবে।