রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন

৬ মাসে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য বিএনপি ও তারেক রহমানকে নিয়ে

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপিকে নিয়ে; আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার এই ছয় মাসে তাদের প্রকাশিত ৩ হাজার ২১০টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অনলাইনে প্রচারিত ভুল তথ্যের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রিউমর স্ক্যানার এই সময়কালে তারেক রহমানকে নিয়ে দলীয় প্রধান হিসেবে ২২৩টি এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১২৮টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে। দুই পরিচয় মিলিয়ে তাকে নিয়ে মোট ৩৫১টি অপতথ্য ছড়ানো হয়।

এসব অপতথ্যের বড় অংশই ছিল নেতিবাচক উপস্থাপনার। দলীয় প্রধান হিসেবে তাকে ঘিরে প্রচারিত অপতথ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শনাক্ত অপতথ্যের প্রায় ৭৩ শতাংশে তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সময়ে বিএনপিকে ঘিরে প্রচারিত অপতথ্যেরও প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল নেতিবাচক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপির নতুন সরকার নিয়ে জুন পর্যন্ত ৩০৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৮৬ শতাংশই সরকারের জন্য নেতিবাচক ছিল। বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়েও ১২৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে ৩৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

তবে প্রান্তিকভিত্তিক বিশ্লেষণে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের চিত্রও দেখতে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। বছরের প্রথম প্রান্তিকে দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে নিয়ে ২২২টি অপতথ্য শনাক্ত হলেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই সংখ্যা নেমে আসে একটিতে।

রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দলীয় রাজনীতিতে তার অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় দলীয় প্রধান পরিচয়কে ঘিরে অপতথ্যের প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় তারেক রহমানের পরেই রয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।

গত ছয় মাসে বিএনপি, দলটির সহযোগী সংগঠন এবং নেতা–কর্মীদের জড়িয়ে ৯৮০টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, যা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, যাদের ঘিরে ৭০২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে এবং এর প্রায় ৮৮ শতাংশ ছিল নেতিবাচক।

অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ে মোট অপতথ্যের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও নেতিবাচকতার হার ছিল সবচেয়ে বেশি। দলটিকে ঘিরে ৩১৫টি অপতথ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই নেতিবাচক। বিপরীতে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে ঘিরে শনাক্ত ৬৫৯টি অপতথ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই ছিল ইতিবাচক বা প্রচারণামূলক প্রকৃতির বলে উল্লেখ করেছে রিউমর স্ক্যানার।

বদলেছে ধরন

প্রান্তিকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের বিস্তার ছিল অনেক বেশি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে রাজনৈতিক অপতথ্য প্রায় ৪৯ শতাংশ কমেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং তাদের শীর্ষ নেতাদের ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

তবে রাজনৈতিক অপতথ্য কমলেও জাতীয় নানা বিষয়, শিক্ষা, খেলাধুলা ও ধর্মীয় বিষয়কে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার বেড়েছে। অর্থাৎ অপতথ্য কমেনি; বরং বিষয়বস্তুর পরিবর্তন ঘটেছে। চলমান ও আলোচিত যেকোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্রুত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

নির্বাচন ঘিরেই বেশি

ছয় মাসে দেশি-বিদেশি ৪২টি আলোচিত বিষয় বিশ্লেষণ করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচনকেন্দ্রিক ৭৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা অন্য যেকোনো দেশীয় ইস্যুর তুলনায় অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এরপর রয়েছে গণভোট, জ্বালানি সংকট, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, হামের প্রাদুর্ভাব, ঈদ, ধর্ষণের ঘটনা, প্রশ্নফাঁস, গ্যাসসংকটসহ বিভিন্ন বিষয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতকে কেন্দ্র করে। ফুটবল বিশ্বকাপ, ভারতের বিধানসভা নির্বাচন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ঘটনাও ছিল অপতথ্য ছড়ানোর বড় উৎস।

প্রথম ছয় মাসে ১০৫টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ৫৩টি ঘটনায় বাংলাদেশি এবং ৫২টি ঘটনায় ভারতীয় পরিচয়ধারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

গণমাধ্যমেও ভুল বেড়েছে

রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষেণ ফেসবুক এখনো অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান প্ল্যাটফর্ম। ছয় মাসে ফেসবুকে ২ হাজার ৮২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে তারা। এ ছাড়া টিকটকে ৬০০টি, ইনস্টাগ্রামে ৫৬২টি, ইউটিউবে ২৪৫টি, এক্সে ১২৪টি এবং থ্রেডসে ১০৬টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে।

শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, মূলধারার গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে বলে রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে যেখানে ৯০টি ঘটনায় গণমাধ্যমের ভুল শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪১টিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ভুল প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে।

একই সঙ্গে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে। ৬ মাসে এ ধরনের ৭২০টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে ৭৩৯টি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। আক্রান্ত ৭০টি সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ৬২টিই বাংলাদেশের।