চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২ স্কুলছাত্রসহ ৪৫ জনের প্রাণহানির ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১১ সালের ১১ জুলাই বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা শেষে ফেরার পথে শিক্ষার্থীদের বহনকারী একটি পিকআপ খাদে পড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দেড় দশক পার হলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোর শোক আজও কাটেনি। পাশাপাশি সে সময় দেওয়া বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত না হওয়ায় আক্ষেপ রয়ে গেছে স্থানীয়দের মাঝে।
দুর্ঘটনায় নিহত ৪৫ জনের মধ্যে ৩৪ জনই ছিল আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এছাড়া আবুতোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪ জন, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার ২ জন, প্রফেসর কামালউদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২ জন, একজন অভিভাবক এবং দুই জন ফুটবলপ্রেমী যুবক প্রাণ হারান। সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি স্মরণ করে আজও শিউরে ওঠেন প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনরা।
নিহত শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিনের মা কোহিনুর বেগম জানান, ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তার মনে হয় এই তো সেদিন ছেলেটি খেলা দেখতে বের হয়েছিল। সন্তান হারানোর এই শোক কোনোভাবেই ভোলার নয় বলে জানান তিনি। আরেক নিহত শিক্ষার্থী আমিন শরীফের বাবা শাহজাহান বলেন, দুর্ঘটনার সময় তিনি প্রবাসে ছিলেন, ছেলের শেষ মুখটুকু দেখতে না পারার কষ্ট তাকে আজও তাড়া করে ফেরে। দুর্ঘটনাস্থলে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ‘অন্তিম’ দেখলে তার বুক ফেটে যায় বলে জানান তিনি।
সেদিনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ফেরা তৎকালীন নবম শ্রেণির ছাত্র সোহরাব হোসেন জানান তার ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, ‘জয়ের আনন্দে আমরা এতটাই উদ্বেলিত ছিলাম যে, কখন ট্রাক উল্টে পানিতে পড়েছি তা টেরই পাইনি। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। বাঁচার জন্য সবাই মরিয়া হয়ে হাত-পা ছুঁড়ছিল। কোনোমতে আমি বের হয়ে আসতে পারলেও অন্যরা পারেনি।’ বেঁচে ফেরার আনন্দ ছাপিয়ে সহপাঠীদের মৃত্যুর কষ্টই তাকে বেশি পোড়ায় বলে জানান তিনি।
আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে নিহতদের স্মরণে ‘আবেগ’ নামের একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এটির নির্মাতা নিজাম মেস্ত্রি নিজেও ওই দুর্ঘটনায় তার সন্তানকে হারিয়েছেন। তার ভাষায়, ছেলে মারা যায়নি, বরং এই স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে সে মানুষের আবেগ হয়ে বেঁচে থাকবে।
এদিকে, দুর্ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদসহ শীর্ষ রাজনীতিকরা মিরসরাইয়ে ছুটে গিয়েছিলেন। আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত শোকসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১১ জুলাইকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ঘোষণা, আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বিআরটিসি বাস চালুর প্রতিশ্রুতি আজও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তবে মিরসরাই স্টেডিয়ামকে মিনি স্টেডিয়ামে রূপান্তরের কাজ বর্তমানে চলমান।
আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বলেন, বর্তমানে তাদের বিদ্যালয়ে প্রায় ১১শ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মিরসরাই ট্র্যাজেডির পরদিন (১২ জুলাই, ২০১১) পিকআপ চালক মফিজুর রহমানকে আসামি করে মিরসরাই থানায় মামলা করেন মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান কবির আহমদ নিজামী। ঘটনার ১০ দিন পর ২১ জুলাই বরিশালের কাউনিয়া থেকে মফিজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চালক মফিজকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। মেয়াদ শেষে ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল মায়ানী ইউনিয়নে নিজ বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে চালক মফিজুর রহমানের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও নিহতদের স্মরণে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শনিবার (১১ জুলাই) সকালে কোরআন খতম, স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা এবং তবারক বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তিবর্গ এবং স্থানীয় গণ্যমান্যদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।