কুষ্টিয়া

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাবে ভুল রিপোর্ট, অবৈধ ডায়াগনিস্টিক সেন্টারের ছড়াছড়ি

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি ল্যাব থেকে ভুল রক্ত পরীক্ষার প্রতিবেদন দিয়ে রোগীদের চরম হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এই ল্যাবের ভুল প্রতিবেদনের জেরে এক শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়ার অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। অন্যদিকে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে হাসপাতালটির মূল ফটকের সামনে গড়ে ওঠা অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দৌরাত্ম্য বন্ধে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। এরই মধ্যে অনিয়মের দায়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে জরিমানা করে এর কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

জানা গেছে, ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের ১৬ দাগ গ্রামের সাগর হোসেনের ২৩ মাস বয়সী শিশু আনাবিয়া পাঁচ দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. নাসরিন আক্তারের শরণাপন্ন হলে তিনি ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া সন্দেহ করে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। হাসপাতালে নেওয়ার আগে স্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রক্ত পরীক্ষায় শিশুটির প্লাটিলেট আসে ১ লাখ ৭৯ হাজার। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে সেখানকার ল্যাবে পুনরায় রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু সরকারি ওই ল্যাবের প্রতিবেদনে প্লাটিলেট মাত্র ৮৯ হাজার উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার বিষয়টি দেখে অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক শিশুটিকে রাজশাহী বা কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর (রেফার) করেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে স্বজনরা পুনরায় বাইরের একটি ল্যাবে পরীক্ষা করালে প্লাটিলেট আসে ১ লাখ ৮৫ হাজার। পরে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানকার চিকিৎসকদেরও সরকারি ল্যাবের প্রতিবেদনটি নিয়ে সন্দেহ হয়। সেখানে পুনরায় পরীক্ষা করালে শিশুটির প্লাটিলেট ১ লাখ ৯০ হাজার পাওয়া যায়। ভুল প্রতিবেদনের কারণে শিশুটির পরিবার চরম মানসিক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একাংশের যোগসাজশে মূল ফটকের সামনে একাধিক অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে ওঠার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের আশপাশে এ ধরনের ক্লিনিক থাকার সুযোগ নেই। এসব অনিয়ম ঠেকাতে সম্প্রতি অভিযান পরিচালনা করেন ভেড়ামারার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ডা. গাজী আশিক বাহার।

অভিযানে ‘বিশ্বাস ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪৫ ধারায় ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জগলুর রহমান লিটন (৬২) উপযুক্ত চিকিৎসক বা মেডিকেল টেকনোলজিস্টের স্বাক্ষর ও সিলমোহর ছাড়াই রোগীদের পরীক্ষার প্রতিবেদন দিচ্ছিলেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত আলাউদ্দিন (৭৪) নামের এক রোগীর সেরোলজিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনে এমন জালিয়াতির প্রমাণ পায়। পাশাপাশি লাইসেন্স নবায়ন না থাকা, জনবল সংকট এবং ভেতরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠানটি আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভুল প্রতিবেদনের বিষয়ে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান জানান, ল্যাবের কর্মীদের প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালটিতে চিকিৎসকদের ২৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৯ জন কর্মরত আছেন।

সার্বিক বিষয়ে কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাবে ভুল প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নির্দেশনায় অনুপস্থিত দুই চিকিৎসককে শোকজ করা হয়েছিল বলেও জানান সিভিল সার্জন।