৩৫ বছর পর পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে বের করে ঋণ শোধ

সৌদি আরবে এক বন্ধুর কাছ থেকে সামান্য কিছু অর্থ ধার নেওয়ার তিন দশকেরও বেশি সময় পর, ভারতের কেরালার বাসিন্দা ইসমাইল কেবল অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি আর বহুদিনের পুরোনো প্রতিজ্ঞা পূরণের তাগিদ নিয়ে সেই বন্ধুকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তার কাছে না ছিল সেই বন্ধুর কোনো ফোন নম্বর, না ছিল ঠিকানা। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই ইসমাইল তার সাবেক সহকর্মী এডলা লাচান্নার সন্ধানে নামেন, যার সঙ্গে তার বহু বছর দেখা হয়নি।

গত ৯ জুলাই তার এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অনুসন্ধান সফল হয় তেলেঙ্গানার জাগতিয়াল জেলার ধর্মপুরীতে। সেখানে তিনি অবশেষে তার বন্ধুর খোঁজ পান এবং কয়েক দশকের সেই ঋণ পরিশোধ করেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে সৌদি আরবের আবকাইক শহরে কাজ করার সময় ইসমাইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তেলেঙ্গানার জাগতিয়াল জেলার ধর্মপুরি এলাকার বাসিন্দা এডলা লাচান্নার। আরও তিনজন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে তারা একই আবাসনে প্রায় পাঁচ বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করেছিলেন। সেই সময়ই একদিন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ইসমাইল বন্ধু লাচান্নার কাছ থেকে ১২০ সৌদি রিয়াল ধার নিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে ওই অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ১,০০০ ভারতীয় রুপির সমান। টাকাটা নেওয়ার সময় ইসমাইল কথা দিয়েছিলেন, সামর্থ্য হলেই তিনি এই ধার শোধ করে দেবেন।

এর কিছুদিন পরই লাচান্না পাকাপাকিভাবে ভারতে ফিরে যান। তখন মোবাইল ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়ার মতো আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম না থাকায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।  তবে ধার নেওয়া অর্থের কথা ভুলে যাননি ইসমাইল।

সম্প্রতি পুরোনো সেই ঋণ শোধের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু বন্ধুর কোনো ফোন নম্বর বা ঠিকানা তার কাছে ছিল না। শুধু মনে ছিল, লাচান্নার বাড়ি ধর্মপুরি এলাকায়। এই সামান্য তথ্যকে ভিত্তি করে অনলাইনে খোঁজ শুরু করেন ইসমাইল। পরে ধর্মপুরিতে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় খুঁজে বের করেন তার পুরোনো বন্ধুকে।

দীর্ঘদিন পর বন্ধুকে ফিরে পেয়ে ইসমাইল লাচান্নার পরিবারের হাতে ২৫ হাজার রুপি তুলে দেন। সে সময় লাচান্না নিজে কাজের সূত্রে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে কথা হয়। লাচান্না জানান, প্রায় ৩৫ বছর আগে দেওয়া মাত্র ১২০ সৌদি রিয়াল ঋণ পরিশোধে ইসমাইল তাকে ২৫,০০০ রূপি ফেরত দেওয়ায় তিনি অবাক হয়েছেন।

ভিডিও কলে লাচান্না বলেন, ‘আমরা দুজনেই সৌদি আরবের আবকাইকে থাকতাম। সন্ধ্যায় আমরা ওর ঘরে যেতাম, একসঙ্গে রান্না করে খেতাম। এভাবেই আমাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়েছিল। পরে আমি ওকে ১২০ রিয়াল ধার দিই। প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা। আমি জানি না ও কীভাবে ১২০ রিয়ালের হিসাব করে আমাকে ২৫ হাজার রুপি দিল। ও অত্যন্ত সৎ ও ভালো মনের একজন মানুষ। মূলত আমাদের বন্ধুত্বের প্রতি সম্মান জানিয়েই ও আমাকে এত বড় অঙ্ক ফেরত দিয়েছে।’

লাচান্না আরও যোগ করেন, ‘আমি জানি না ও এই অঙ্কের সঙ্গে সুদ যোগ করেছে কি না। ১৯৯১ সালে ১২০ রিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে ভারতে প্রায় এক হাজার রুপি টাকা পাওয়া যেত। যেহেতু অনেক বছর কেটে গেছে, ও হয়তো হিসাব করে মূল্যস্ফীতি বা সুদ যোগ করে ফেরত দিয়েছে। তবে ও যে এত বছর পর এসে এই টাকাটা ফেরত দিয়ে ওর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, তার জন্য আমি ওর কাছে চিরকৃতজ্ঞ।’

সৌদি আরবের মরুভূমিতে গড়ে ওঠা দুই তরুণের সেই সাধারণ বন্ধুত্ব আজ এক অনন্য সততার নজির হয়ে রইল তেলেঙ্গানার ধর্মপুরীর সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।