বিশ্বকাপের মঞ্চ বড় নিষ্ঠুর। এখানে এক মুহূর্তে নায়ক থেকে কেউ হয়ে যান খলনায়ক। আবার পরাজয়ের মধ্যেও কেউ হয়ে ওঠেন অমর। ট্রফি জেতার সৌভাগ্য সবার কপালে জোটে না, গোল্ডেন বুটও ওঠে না প্রত্যেক মহাতারকার হাতে। তবু কিছু ফুটবলার আছেন, যাদের পদচারণায় একটি বিশ্বকাপের স্মৃতি চিরকাল উজ্জ্বল থাকে। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে নরওয়ের আর্লিং হালান্ড ঠিক তেমনই এক নাম।
রোববার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে শেষ বাঁশি বাজতেই থেমে যায় নরওয়ের স্বপ্নযাত্রা। ২-১ গোলের পরাজয়ে বিদায় নেয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি। একই সঙ্গে থেমে যায় হালান্ডের গোলের ঝড়ও। গোল্ডেন বুটের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। কারণ তার ৭ গোল আর বাড়ানোর সুযোগ নেই। অথচ সেমিফাইনালে উঠে যাওয়া লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যেই ৮টি করে গোল নিয়ে এগিয়ে আছেন। বিশ্বকাপের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট এখন তার নাগালের বাইরে।
কিন্তু সংখ্যার এই ছোট্ট ব্যবধান কখনোই হালান্ডের বিশ্বকাপকে ছোট করে না। এটা ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ। অথচ অভিজ্ঞতার কোনো ঘাটতি ছিল না। প্রথম ম্যাচ থেকেই গোলের গন্ধ শুঁকে বেড়ানো এই স্ট্রাইকার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ক্লাব ফুটবলের মতো জাতীয় দলের জার্সিতেও তিনি একই রকম নির্মম। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সঙ্গে তার প্রতিটি লড়াই ছিল যেন ঝড়ের সঙ্গে দেওয়ালের যুদ্ধ। শক্তি, গতি, উচ্চতা, নিখুঁত ফিনিশিং। সবমিলিয়ে প্রতিটি ম্যাচেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভয়ঙ্কর এক আক্রমণভাগের প্রতীক।
সাত গোলের প্রতিটিই আলাদা গল্প। কোথাও মাথার ঝাঁপ, কোথাও দ্রুতগতির স্প্রিন্ট, কোথাও আবার এক ছোঁয়ায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করা। গোল করার শিল্পকে তিনি যেন নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তবে এই বিশ্বকাপে হালান্ডের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লেখা হয়েছে শেষ ষোলোয়। প্রতিপক্ষ ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে নরওয়েকে খুব কম মানুষই এগিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই রাতে আলোটা নিজের করে নেন হালান্ড। জোড়া গোলে ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে দেন তিনি। সেলেসাওদের বিদায়ের কান্নার ভেতর জন্ম নেয় নরওয়ের নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারানো দলগুলোর তালিকায় জায়গা করে নেয় নরওয়ে।
আর সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য হালান্ড। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ছিলেন নরওয়ের প্রাণভোমরা। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখেছেন, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, প্রয়োজনের মুহূর্তে গোল করেছেন, আবার কখনো নিজের উপস্থিতি দিয়েই ম্যাচের গতি বদলে দিয়েছেন। আধুনিক ফুটবলে একজন পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাইকারের যে সংজ্ঞা, তার প্রতিটি রেখাই যেন আঁকা আছে হালান্ডের খেলায়।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আসরেই সাত গোল করার কীর্তি এমনিতেই বিরল। আরও বিরল এমন ধারাবাহিকতা, যা একজন ফুটবলারকে প্রথম টুর্নামেন্টেই বিশ্বের সেরা গোলদাতাদের কাতারে বসিয়ে দেয়। এই বিশ্বকাপে গোলসংখ্যার বিচারে তার ওপরে আছেন কেবল মেসি ও এমবাপ্পে। দুজনই এখনও সেমিফাইনালে খেলবেন। আর এটাই হয়তো হালান্ডের একমাত্র দুর্ভাগ্য। দল বিদায় নেওয়ায় ব্যক্তিগত লড়াইও শেষ হয়ে গেছে তার।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে ব্যক্তিগত পুরস্কারের ভাগ্য অনেক সময় নির্ভর করে দলের সাফল্যের ওপর। যদি নরওয়ে আরেক ধাপ এগোতে পারত, তাহলে হয়তো গোল্ডেন বুটের ছবিটাই অন্যরকম হতো। কিন্তু নকআউট ফুটবল কাউকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। তবু এই বিদায়ে হালান্ডের জন্য হতাশার চেয়ে গর্বই বেশি। কারণ তিনি প্রমাণ করেছেন, নরওয়ে এখন আর শুধু সম্ভাবনার দল নয়; তারা বড় শক্তিগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়তে পারে। আর সেই সাহসের সবচেয়ে বড় প্রতীক তাদের ২৫ বছর বয়সী গোলমেশিন। গোল্ডেন বুট এবার তার হাতে উঠবে না। কিন্তু বিশ্বকাপ তাকে এমন এক স্বীকৃতি দিয়েছে, যা ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়েও বড়। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আগামী এক দশক বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর নামগুলোর একটি হবে আর্লিং হালান্ড।